স্বৈরশাসক থেকে উন্নয়নের জাদুকর: কীভাবে দক্ষিণ কোরিয়াকে বদলে দিয়েছিলেন পার্ক চুং-হি?.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

স্বৈরশাসক থেকে উন্নয়নের জাদুকর: কীভাবে দক্ষিণ কোরিয়াকে বদলে দিয়েছিলেন পার্ক চুং-হি?..

শাহরিয়ার কবির  avatar   
শাহরিয়ার কবির
স্বৈরশাসক থেকে উন্নয়নের জাদুকর: কীভাবে দক্ষিণ কোরিয়াকে বদলে দিয়েছিলেন পার্ক চুং-হি?..
স্বৈরশাসক থেকে উন্নয়নের জাদুকর: কীভাবে দক্ষিণ কোরিয়াকে বদলে দিয়েছিলেন পার্ক চুং-হি?..
ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৯ সালের ২৬ অক্টোবর সিউলের এক গেস্টহাউসে নিভে যায় আধুনিক দক্ষিণ কোরিয়ার রূপকার পার্ক চুং-হির জীবনপ্রদীপ। কঠোর স্বৈরশাসন আর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে কীভাবে এশিয়ার অর্থ..

১৯৭৯ সালের ২৬ অক্টোবর। রাজধানী সিউলের একটি সুরক্ষিত সরকারি গেস্টহাউসে হঠাৎই বেজে ওঠে গুলির শব্দ। মুহূর্তের মধ্যে সব নিস্তব্ধ করে দিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন আধুনিক দক্ষিণ কোরিয়ার রূপকার ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি। একটি যুগের অবসান ঘটে আকস্মিক এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। তবে মৃত্যুর চার দশক পরেও দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে এক অত্যন্ত বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে বেঁচে আছেন এই নেতা। একাধারে লৌহমানব ও স্বৈরশাসক হিসেবে পরিচিত পার্ক চুং-হি কীভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত একটি দেশকে আজকের অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত করেছিলেন, তা আজও বিশ্ব রাজনীতির এক বিস্ময়কর অধ্যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং কোরীয় যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলার পর ১৯৫০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র একটি দেশ। মাথাপিছু আয় ছিল তলানিতে, আর নির্ভর করতে হতো বিদেশি ত্রাণের ওপর। এমন এক হতাশার সময়ে ১৯৬১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন মেজর জেনারেল পার্ক চুং-হি। ক্ষমতা গ্রহণের পরই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রচলিত রাজনীতি দিয়ে এই গরিব দেশের ভাগ্য বদলানো সম্ভব নয়। তাই তিনি গ্রহণ করেন কঠোর ও নজিরবিহীন কিছু অর্থনৈতিক ও সামাজিক পদক্ষেপ। গণতন্ত্রকে সাময়িকভাবে স্থগিত করে তিনি দেশ পরিচালনার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন এবং নিজেকে একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

পার্ক চুং-হির অর্থনৈতিক মডেলের মূল ভিত্তি ছিল রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন। তিনি জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেলকে সামনে রেখে দেশের শীর্ষস্থানীয় কিছু উদ্যোক্তাকে বেছে নেন এবং তাদের বিশেষ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও ভর্তুকি প্রদান করেন। এর থেকেই জন্ম নেয় স্যামসাং, হুন্দাই ও এলজির মতো বিশ্বখ্যাত সব জায়ান্ট কোম্পানি বা 'চাবল' (Chaebol)। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি নেন যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ। তার নেওয়া 'সেমাউল উন্দং' বা নতুন গ্রাম আন্দোলন গ্রামীণ অর্থনীতিতে এনে দেয় অভূতপূর্ব গতিশীলতা। কঠোর হাতে দুর্নীতি দমন এবং রাতারাতি উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার ফলে কোরিয়ার প্রবৃদ্ধির হার আকাশচুম্বী হতে শুরু করে।

তবে এই অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ মানুষকে। পার্ক চুং-হির শাসনকাল ছিল অত্যন্ত দমনমূলক ও রূঢ়। রাজনৈতিক ভিন্নমত কঠোরহস্তে দমন করা হতো, সংবাদপত্রের ওপর ছিল সেন্সরশিপ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সাধারণ নাগরিকরা উন্নত ভবিষ্যতের আশায় তার স্বৈরাচারী শাসন মুখ বুজে সহ্য করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছরের শাসনের পর ১৯৭৯ সালের ২৬ অক্টোবর তার নিজ দেশের গোয়েন্দা প্রধানের গুলিতেই তার জীবনাবসান ঘটে, যা কোরিয়ান রাজনীতিতে এক অভাবনীয় মোড় এনে দেয়।

আজকের উন্নত, প্রযুক্তি-নির্ভর ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে তাকালে পার্ক চুং-হির অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাকে একদিকে যেমন নির্মম এক স্বৈরশাসক হিসেবে ঘৃণা করেন অনেকে, অন্যদিকে তেমনি দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক মুক্তির মহানায়ক হিসেবেও শ্রদ্ধা জানান দেশটির কোটি মানুষ। ইতিহাসের এই ধূসর অধ্যায় প্রমাণ করে, একনায়কসুলভ কঠোর নেতৃত্ব কীভাবে একটি জাতিকে চরম দুর্দশা থেকে টেনে তুলে বিশ্বের দরবারে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করতে পারে।

সোর্স: www.youtube.com

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator