২০২৩ সালের অক্টোবরে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ (Department of Commerce) যখন উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপস এবং চিপ-ম্যানুফ্যাকচারিং সরঞ্জাম চীনের কাছে বিক্রিতে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করে, তখন বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম হয়। এই পদক্ষেপটি কেবল চীনের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জন্য সেমিকন্ডাক্টর কূটনীতির এক জটিল ফাঁদ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তার মিত্র দেশগুলোও চীনের ওপর একই ধরনের প্রযুক্তিগত চাপ বজায় রাখুক, যা বাংলাদেশকে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ মূলত প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। বৈশ্বিক চিপ উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে তাইওয়ানের টিএসএমসি (TSMC) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাংয়ের (Samsung) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য অনস্বীকার্য, কিন্তু সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের এবং উৎপাদনে এশীয় দেশগুলোর ভূমিকা পরস্পর নির্ভরশীল। চীনের 'মেড ইন চায়না ২০২৫' কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক আধিপত্যের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এরই ফলস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল (ASML) এবং জাপানের প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে যাতে তারা চীনের কাছে অত্যাধুনিক লিথোগ্রাফি সরঞ্জাম বিক্রি বন্ধ করে। এই চাপ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য একটি দ্বিধাবিভক্ত পরিস্থিতি তৈরি করেছে: একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে চীনের বিশাল বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ হাতছাড়া না করার বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে সেমিকন্ডাক্টর নীতি প্রণয়ন করতে হচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক জোট যেমন BIMSTEC এবং সার্কের (SAARC) মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ অন্বেষণ করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে বিভাজিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এই সেমিকন্ডাক্টর কূটনীতি কেবল প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা বা বাজার প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প যেমন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তেমনি ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিক্স ও আইসিটি খাতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হলে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তির সাথে মানিয়ে চলা অত্যাবশ্যক। UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সফল অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর খাতে একটি নিরপেক্ষ ও স্থিতিশীল ভূমিকা পালন করতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের থেকেই বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আকর্ষণ করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র যখন 'চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট' (CHIPS and Science Act) এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকে উৎসাহিত করছে, তখন চীনও তার নিজস্ব চিপ শিল্পে বিপুল পরিমাণ সরকারি ভর্তুকি দিচ্ছে। এই দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং (ATP) শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। এটি কেবল প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগই আনবে না, বরং উচ্চ প্রযুক্তির কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণে সাহায্য করবে।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ (আনুমানিক) |
|---|---|---|---|---|
| বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার আকার (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ৪৩৯ | ৫৭৪ | ৫৮০ | ৫২০ |
| চীনের সেমিকন্ডাক্টর আমদানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ৩৫০ | ৪৩২ | ৪১৫ | ৩৫০ |
| যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সক্ষমতা (% বৈশ্বিক) | ১২ | ১১ | ১০ | ১০ |
| তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সক্ষমতা (% বৈশ্বিক) | ২২ | ২৩ | ২৪ | ২৫ |
| বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ৫.২ | ৬.৮ | ৭.৫ | ৬.৯ |
উৎস: সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (SIA), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO), বাংলাদেশ ব্যাংক
সুপারিশ
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি 'সেমিকন্ডাক্টর কূটনীতি টাস্কফোর্স' গঠন করতে হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা জোরদার করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা হবে। এই টাস্কফোর্সকে প্রতি ৬ মাস অন্তর সরকারের কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
- BIMSTEC ও সার্কের মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর প্ল্যাটফর্মে 'আঞ্চলিক প্রযুক্তি সহযোগিতা চুক্তি' (Regional Technology Cooperation Agreement) প্রস্তাব করতে হবে, যা সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং (ATP) খাতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়ে সহায়তা করবে। এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি আঞ্চলিক তহবিল গঠনের প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে (ICT Division) 'জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর উন্নয়ন নীতি ২০২৫' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্থানীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারি বিনিয়োগের রূপরেখা থাকবে এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা (যেমন: ট্যাক্স হলিডে, ফাস্ট-ট্র্যাক ক্লিয়ারেন্স) অন্তর্ভুক্ত থাকবে।