মাটির প্রাণ, ফসলের পুষ্টি: বাংলাদেশের অর্গানিক ফার্মিংয়ে অনুজীবের জাদু

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
মাটির প্রাণ, ফসলের পুষ্টি: বাংলাদেশের অর্গানিক ফার্মিংয়ে অনুজীবের জাদু
মাটির প্রাণ, ফসলের পুষ্টি: বাংলাদেশের অর্গানিক ফার্মিংয়ে অনুজীবের জাদু
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে জৈব সার ও অনুজীবভিত্তিক কৃষি পদ্ধতির ব্যবহার গত পাঁচ বছরে প্রায় ২৭...

সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে জৈব সার ও অনুজীবভিত্তিক কৃষি পদ্ধতির ব্যবহার গত পাঁচ বছরে প্রায় ২৭% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী রাসায়নিক সারনির্ভর কৃষির বিকল্প হিসেবে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। বিশেষ করে, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'জৈব কৃষি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৪' এর আওতায় অনুজীব সার উৎপাদন ও প্রয়োগে কৃষকদের ভর্তুকি ও প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনছে। এই নীতিমালার প্রবর্তন এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ ও রাসায়নিকমুক্ত খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে এবং বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে অনুজীবের ভূমিকা নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় অনুজীবের প্রয়োগ বহু আগে থেকেই শুরু হলেও, সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর যৌথ উদ্যোগে বায়ো-ফার্টিলাইজার (জৈব সার) নিয়ে পরিচালিত গবেষণাগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। BARI-এর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ কর্তৃক উদ্ভাবিত রাইজোবিয়াম, অ্যাজোলা এবং নীলাভ-সবুজ শৈবাল ভিত্তিক জৈব সারগুলো ডাল, তেলবীজ এবং ধান চাষে রাসায়নিক সারের ব্যবহার প্রায় ২০-৩০% হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে। এই অনুজীবগুলো বায়ুমণ্ডলীয় নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে এবং মাটিতে ফসফরাস ও পটাসিয়ামের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি করে, যা মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গুণাগুণ উন্নত করে। উদাহরণস্বরূপ, BRRI কর্তৃক উদ্ভাবিত ধান চাষের জন্য রাইজোবিয়াম-ভিত্তিক জৈব সার প্রয়োগে ধানের ফলন ১০-১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। এই প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতেও সহায়তা করছে, কারণ রাসায়নিক সারের দাম ক্রমশ বাড়ছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই প্রযুক্তিগুলোর মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণে DAE কে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে, যা কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রদর্শনী প্লট স্থাপনের মাধ্যমে জৈব কৃষি পদ্ধতির প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় অনুজীবের ভূমিকা কেবল পুষ্টি সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মাটিকে রোগমুক্ত রাখতে এবং ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রাইকোডার্মা ও সিউডোমোনাস এর মতো উপকারী অনুজীবগুলো মাটির ক্ষতিকারক ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া দমনে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। BARI-এর উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক উদ্ভাবিত ট্রাইকোডার্মা-ভিত্তিক জৈব বালাইনাশক আলু, টমেটো এবং বেগুনের ঢলে পড়া রোগ নিয়ন্ত্রণে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অনুজীবগুলো মাটির জৈব পদার্থ পচনেও সাহায্য করে, যা মাটির গঠন উন্নত করে এবং জল ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমেও ফসল তুলনামূলকভাবে কম সেচে টিকে থাকতে পারে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের 'জাতীয় পরিবেশ নীতি ২০১৮' এর অধীনে কৃষি জমিতে রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে এই অনুজীব-ভিত্তিক জৈব বালাইনাশকগুলো একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কেবল পরিবেশ দূষণই কমায় না, বরং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেও সরাসরি অবদান রাখে, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অপরিহার্য।

বছর জৈব সার ও অনুজীবভিত্তিক কৃষি পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধির হার (%) রাসায়নিক সারের ব্যবহার হ্রাস (%) জৈব কৃষি পণ্যের রপ্তানি মূল্য (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
২০১৯-২০ ১২.৫ ৮.০ ৫.২
২০২০-২১ ১৫.৩ ১০.৫ ৭.৮
২০২১-২২ ১৯.৮ ১৩.২ ১০.৩
২০২২-২৩ ২৩.১ ১৫.৫ ১২.৭
২০২৩-২৪ ২৭.০ ১৮.১ ১৫.৯

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর বার্ষিক প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'জাতীয় জৈব কৃষি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৪' এর আওতায় অনুজীব সার উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকে (SMEs) সহজ শর্তে ঋণ এবং কর মওকুফের ব্যবস্থা করবে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত কৃষি ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে।
  • DAE, BARI এবং BRRI এর সমন্বয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হবে, যা প্রতি উপজেলায় কমপক্ষে দুটি করে 'অনুজীব সার প্রদর্শনী খামার' স্থাপন করবে এবং কৃষকদের জন্য নিয়মিত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করবে, যার অর্থায়ন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) করবে।
  • খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) যৌথভাবে জৈব কৃষি পণ্যের জন্য একটি কঠোর সার্টিফিকেশন ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করবে, যা 'বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩' এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য স্বীকৃত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator