মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে পিছিয়ে থাকার কারণ ও করনীয়

ড. সাবরিনা ইয়াসমিন  avatar   
ড. সাবরিনা ইয়াসমিন
মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে পিছিয়ে থাকার কারণ ও করনীয়
মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে পিছিয়ে থাকার কারণ ও করনীয়
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতের গবেষণা ও উন্নয়নে, বিশেষত জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মতো অত্যাধুনিক বায়োটে...

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতের গবেষণা ও উন্নয়নে, বিশেষত জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মতো অত্যাধুনিক বায়োটেকনোলজিতে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মাথাপিছু স্বাস্থ্য গবেষণায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ সর্বনিম্ন। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবেশী দেশ ভারতে যেখানে মোট জিডিপির প্রায় ০.৭% স্বাস্থ্য গবেষণায় ব্যয় হয়, সেখানে বাংলাদেশে এই হার ০.০৪% এরও কম। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং বায়োটেকনোলজি সক্ষমতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে, যা কোভিড-১৯ মহামারীর সময় টিকার গবেষণা ও উৎপাদনে আমাদের পরাধীনতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল। অথচ, সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ, ক্যান্সার চিকিৎসা এবং জেনেটিক ডিসঅর্ডার নির্ণয়ে জিনোম সিকোয়েন্সিং একটি অপরিহার্য হাতিয়ার, যার সক্ষমতা অর্জনে আমরা এখনো প্রাথমিক ধাপেই রয়েছি।

জিনোম সিকোয়েন্সিং একটি অত্যন্ত ডেটা-নির্ভর এবং অবকাঠামো-নির্ভর প্রযুক্তি। এর সফল বাস্তবায়নের জন্য অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি, উচ্চ প্রশিক্ষিত বিজ্ঞানী ও গবেষক দল এবং শক্তিশালী বায়োইনফরম্যাটিক্স সক্ষমতা প্রয়োজন। বাংলাদেশে, এই তিনটিরই অপ্রতুলতা প্রকট। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থাকলেও, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে গবেষণার সুযোগ সীমিত। প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট, সিকোয়েন্সার এবং উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ক্লাস্টারের অভাবে অনেক গবেষণা প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা এবং পেটেন্ট অর্জনেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল, যা বৈশ্বিক গবেষণা মানচিত্রে আমাদের অস্তিত্বকে ম্লান করে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য গবেষণা খাতে বার্ষিক বরাদ্দ বৃদ্ধি না পেলে ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আরও অনেক পিছিয়ে পড়ব, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে পিছিয়ে থাকার একটি প্রধান কারণ হলেও, এটি একমাত্র কারণ নয়। কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের অনীহাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে ঋণ ও অনুদান দিলেও, বাংলাদেশে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মতো উচ্চ-প্রযুক্তি নির্ভর গবেষণায় তাদের সরাসরি বড় আকারের বিনিয়োগ এখনো সেভাবে আসেনি। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ যেমন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ কেয়ার অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৬-২০২১) বা অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) তে বায়োটেকনোলজিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চলছে। প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং গবেষণা অনুদান বিতরণে স্বচ্ছতার অভাবও গবেষকদের নিরুৎসাহিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, জিনোম ডেটা সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা না থাকায় ডেটা শেয়ারিং এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, আমরা কেবল রোগের উৎস সনাক্তকরণেই নয়, বরং রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ের নতুন পথ উন্মোচনেও ব্যর্থ হচ্ছি।

সূচক বাংলাদেশ (২০২২) ভারত (২০২২) দক্ষিণ কোরিয়া (২০২২)
মাথাপিছু স্বাস্থ্য গবেষণা ব্যয় (মার্কিন ডলার) ৩.৫ ২৫.২ ১৪৫.০
জিডিপির শতাংশ হিসেবে স্বাস্থ্য গবেষণা ব্যয় ০.০৪% ০.৭% ৪.৮%
জিনোম সিকোয়েন্সিং ল্যাব সংখ্যা (আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন) ২-৩ ৫০+ ২০০+
বায়োটেকনোলজি পেটেন্ট (বার্ষিক গড়) ০-২ ১০০+ ১০০০+

উৎস: World Bank, Global Innovation Index, Scientific American (বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংকলিত)

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে 'জাতীয় জিনোমিক্স ও বায়োটেকনোলজি গবেষণা তহবিল' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক বাজেট থেকে মোট জিডিপির কমপক্ষে ০.৫% বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং World Bank ও ADB-এর মাধ্যমে উচ্চ-প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য সরাসরি অনুদান ও ঋণ আকর্ষণ করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'জাতীয় জিনোম ডেটা সুরক্ষা ও ব্যবহার আইন' প্রণয়ন করতে হবে, যা ব্যক্তিগত জিনোম ডেটা সংরক্ষণ, শেয়ারিং এবং গবেষণায় ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করবে এবং গবেষকদের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করবে, পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (BMRC) কে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগগুলিতে অত্যাধুনিক জিনোম সিকোয়েন্সার, বায়োইনফরম্যাটিক্স সার্ভার এবং প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট ক্রয়ের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে এবং গবেষণার মানোন্নয়নে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা ও পেটেন্ট অর্জনে প্রণোদনা প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সাবরিনা ইয়াসমিন

ড. সাবরিনা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator