বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রথম নারী অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফাতেমা সুলতানার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও ঐতিহাসিক অর্জন..

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রথম নারী অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফাতেমা সুলতানার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও ঐতিহাসিক অর্জন..
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রথম নারী অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফাতেমা সুলতানার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও ঐতিহাসিক অর্জন..
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ইতিহাসে প্রথম নারী অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গেছেন চাঁদপুরের কৃতী সন্তান ফাতেমা সুলতানা। অষ্টম বিসিএস ক্যাডার হিসেবে দীর্ঘ সাড়ে তিন দ..

বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে ২০২৩ সালের ২২ জুন প্রথম নারী অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন ফাতেমা সুলতানা। ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর অষ্টম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পরিচালক পদে যোগদানের পর দীর্ঘ প্রায় ৩৪ বছরের কর্মজীবনে তিনি বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সঙ্গে পালন করেছেন। চাঁদপুরের মতলব উপজেলার লুধুয়া গ্রামের সন্তান ফাতেমা সুলতানা কেবল বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির ইতিহাসই গড়েননি, বরং প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতার এক অনন্য নজির স্থাপন করে ২০২৩ সালের ৬ জুলাই স্বাভাবিক অবসরে গমন করেন। তার এই নিয়োগ ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কাঠামোতে নারীর অংশগ্রহণের এক মাইলফলক, যা পরবর্তীতে অনেক নারী কর্মকর্তার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এডিজি হিসেবে তার এই পদায়ন বাহিনীর শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর কার্যকর উপস্থিতিকে নিশ্চিত করে এবং বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক সংস্কারে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

ফাতেমা সুলতানার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, তিনি মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে সদর দপ্তরের নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা জেলায় সহকারী পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করে তিনি কুমিল্লা রেঞ্জ, সদর দপ্তরের যোগাযোগ, রেকর্ড, প্রকল্প ও প্রশিক্ষণ শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নিজের সক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছেন। উপপরিচালক হিসেবে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়, আনসার-ভিডিপি একাডেমি এবং ৩৩ আনসার ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তার প্রশাসনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের গভীরতাকে প্রমাণ করে। পরবর্তীতে পরিচালক হিসেবে সিএইচটি অপারেশন এবং উপমহাপরিচালক হিসেবে ঢাকা ও রাজশাহী রেঞ্জের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিলেন, তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সদর দপ্তরের নীতিনির্ধারণী দক্ষতার এই সমন্বয়ই তাকে বাহিনীর প্রথম নারী এডিজি হওয়ার পথ সুগম করে দিয়েছিল, যা একজন পেশাদার কর্মকর্তার জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও গৌরবময় একটি অর্জন।

পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে ফাতেমা সুলতানা কেবল দেশীয় প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করেননি, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নিজের জ্ঞানকে বিস্তৃত করেছেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভাইটাল ইন্সটলেশন সিকিউরিটি বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিরাপত্তা বিষয়ক উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন, যা তার কর্মজীবনে আধুনিক ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করতে সহায়ক হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তার কন্যা ফাতেমা সুলতানা পারিবারিক ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রেখে যেভাবে সাফল্যের চূড়ায় আরোহণ করেছেন, তা বর্তমান সময়ের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল। তার অবসরের মধ্য দিয়ে বাহিনীর একটি গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, তিনি যে কর্মসংস্কৃতি ও পেশাদারিত্বের ধারা রেখে গেছেন, তা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রায় একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীতিনির্ধারণী পদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তার এই অর্জন একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ফাতেমা সুলতানার এই সাফল্যগাথা কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে নারীর সক্ষমতা ও নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার একটি শক্তিশালী বার্তা। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের নিরলস পরিশ্রম, সততা এবং দেশপ্রেমের সমন্বয়ে তিনি যে উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গেছেন, তা নতুন প্রজন্মের নারী কর্মকর্তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং একইসঙ্গে বড় অনুপ্রেরণা। চাঁদপুরের লুধুয়া গ্রাম থেকে উঠে আসা এই নারী কর্মকর্তা প্রমাণ করেছেন যে, কঠোর মনোবল ও পেশাদারিত্ব থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করে বাহিনীর শীর্ষস্থানে পৌঁছানো সম্ভব। তার অবসরের পরেও বাহিনীতে নারীর অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের যে ধারা উন্মোচিত হয়েছে, তা আগামী দিনে বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোতে নারী নেতৃত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator