সম্প্রতি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট (এসিইউ) কর্তৃক স্থানীয় পর্যায়ের একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ তদন্ত শুরু করার ঘটনা ক্রীড়াঙ্গনে আবারও 'জিরো টলারেন্স' নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে কিছু অনিয়মিত বাজি ধরার ধরন এবং সন্দেহজনক খেলার প্যাটার্ন চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ক্রীড়া আইনের কঠোর প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে। এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বৈশ্বিক ক্রীড়া সংস্থাগুলো ফিক্সিং ও ডোপিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, স্থানীয় পর্যায়ে আইনের মারপ্যাঁচ এবং বাস্তবায়নের দুর্বলতা এই নীতিকে প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
খেলার সততা রক্ষা এবং ডোপিং প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যেমন ওয়ার্ল্ড অ্যান্টি-ডোপিং এজেন্সি (WADA) এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) এর অ্যান্টি-ডোপিং কোড ও অ্যান্টি-করাপশন কোড অত্যন্ত কঠোর। WADA-এর কোড অনুযায়ী, কোনো ক্রীড়াবিদ নিষিদ্ধ পদার্থ সেবন করলে তার ওপর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে ডোপিংয়ের কারণে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটারও ছিলেন, যাকে ২০১৮ সালে নিষিদ্ধ পদার্থের জন্য ৮ বছরের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছিল। এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ সত্ত্বেও, স্থানীয় পর্যায়ে প্রায়শই দেখা যায়, খেলোয়াড়দের মধ্যে ডোপিং সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং ফিক্সিংয়ের ফাঁদে পড়ার প্রবণতা বিদ্যমান। এর একটি কারণ হলো, আন্তর্জাতিক কোডগুলো স্থানীয় আইনে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত না হওয়া অথবা অন্তর্ভুক্ত হলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগের অভাব। অনেক সময়, স্থানীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অ্যান্টি-ডোপিং পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল তৈরিতে ব্যর্থ হয়।
ক্রীড়া আইনে 'জিরো টলারেন্স' নীতি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং প্রমাণ সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা। ফিক্সিংয়ের ক্ষেত্রে, অপরাধীরা প্রায়শই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে, যা তাদের সনাক্তকরণ ও প্রমাণ সংগ্রহকে কঠিন করে তোলে। এছাড়া, ডোপিংয়ের ক্ষেত্রে, নতুন নতুন নিষিদ্ধ পদার্থের আগমন এবং সেগুলোর দ্রুত শনাক্তকরণের জন্য অত্যাধুনিক পরীক্ষাগারের অভাব একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ক্রীড়াঙ্গনে সততা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, বিদ্যমান আইনগুলো প্রায়শই আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট কোনো 'স্পোর্টস ফিক্সিং আইন' নেই, যার ফলে ফিক্সিংয়ের ঘটনাগুলো ফৌজদারি আইনের আওতায় আনা হলেও, তা ক্রীড়াঙ্গনের বিশেষত্ব বিবেচনায় যথেষ্ট নয়। এতে করে অপরাধীরা অনেক সময় আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যায়, যা 'জিরো টলারেন্স' নীতির মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। World Bank এবং ADB-এর মতো সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময় সুশাসন ও দুর্নীতি দমনের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করলেও, ক্রীড়াঙ্গনে সুনির্দিষ্টভাবে ফিক্সিং ও ডোপিং প্রতিরোধে আইনগত অবকাঠামো উন্নয়নে তাদের সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ সীমিত।
| বিষয় | সাল | তথ্য | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| WADA-এর নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত পদার্থের জন্য ডোপিং কেস (ক্রিকেট) | ২০১৮-২০২২ | বিশ্বব্যাপী ৪৩টি কেস | এর মধ্যে ৩টি এশীয় দেশের খেলোয়াড় জড়িত |
| আইসিসি কর্তৃক ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য নিষিদ্ধ খেলোয়াড়ের সংখ্যা | ২০১৭-২০২১ | ২৯ জন | বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া খেলোয়াড় |
| বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিষদ (বিকেএসপি) এর ডোপিং টেস্টের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট | ২০২০-২১ অর্থবছর | ১.৫ কোটি টাকা | আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় যথেষ্ট নয় |
| বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর ক্রীড়া সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা | ২০১৯-২০২২ | ২টি | ক্রীড়া দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সংখ্যা খুবই কম |
উৎস: WADA বার্ষিক রিপোর্ট, ICC অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট রিপোর্ট, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বাজেট ডকুমেন্ট, দুদক বার্ষিক প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী 'বাংলাদেশ স্পোর্টস ইন্টিগ্রিটি ইউনিট' (BSIU) গঠন করতে হবে, যা WADA এবং ICC-এর কোডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্রীড়াঙ্গনে ডোপিং ও ফিক্সিং প্রতিরোধে স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করবে এবং এর জন্য বাংলাদেশ সরকারের বাজেট থেকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
- জাতীয় সংসদকে 'ক্রীড়া আইন, ২০২৩' (বা প্রস্তাবিত যেকোনো নতুন আইন) প্রণয়নের সময় ম্যাচ ফিক্সিং ও ডোপিংয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট, কঠোর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শাস্তিমূলক বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেখানে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে এবং World Bank ও ADB-এর সুশাসন কর্মসূচির আওতায় আইনি কাঠামো উন্নয়নে কারিগরি সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
- সকল জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-কে তাদের খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মিতভাবে বাধ্যতামূলক 'অ্যান্টি-ডোপিং ও অ্যান্টি-করাপশন সচেতনতা প্রোগ্রাম' আয়োজন করতে হবে, যা WADA-এর নির্দেশিকা অনুসরণ করে পরিচালিত হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ডোপিং ও ফিক্সিংয়ের কুফল সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।