সোশ্যাল মিডিয়ার 'লাইক' সংস্কৃতি: আসক্তি নাকি অ্যালগরিদমের ফাঁদ?

সাদমান সাকিব  avatar   
সাদমান সাকিব
সোশ্যাল মিডিয়ার 'লাইক' সংস্কৃতি: আসক্তি নাকি অ্যালগরিদমের ফাঁদ?
সোশ্যাল মিডিয়ার 'লাইক' সংস্কৃতি: আসক্তি নাকি অ্যালগরিদমের ফাঁদ?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা গেছে যে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ১২ কোটি ছা...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা গেছে যে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ১২ কোটি ছাড়িয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী। এই বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারী, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, এখন এক নতুন ডিজিটাল সংস্কৃতির অংশীদার, যেখানে 'লাইক' এবং 'শেয়ার'-এর মতো বিষয়গুলো কেবল একটি প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সামাজিক স্বীকৃতি ও ব্যক্তিগত মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, এই 'লাইক' সংস্কৃতি কি কেবল একটি বিনোদনমূলক প্রবণতা নাকি এটি ব্যবহারকারীদের মধ্যে গভীর আসক্তি তৈরি করছে এবং একই সাথে অ্যালগরিদমের অদৃশ্য ফাঁদে তাদের আবদ্ধ করে ফেলছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে। যখন একজন ব্যবহারকারী তার পোস্টে একটি 'লাইক' বা ইতিবাচক মন্তব্য পান, তখন তার মস্তিষ্কে এক ধরনের পুরস্কারের অনুভূতি তৈরি হয়, যা তাকে আরও বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে ব্যয় করতে উৎসাহিত করে। এই চক্রাকারে চলতে থাকা প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক ধরনের আচরণগত আসক্তি তৈরি করে, যা মাদকাসক্তির মতোই শক্তিশালী হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অফ ডিজিজেস (ICD-11)-এ 'গেমিং ডিসঅর্ডার'কে একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আসক্তিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তিকে সরাসরি রোগ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়নি, তবে এর লক্ষণ ও প্রভাব গেমিং ডিসঅর্ডারের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই সাদৃশ্যপূর্ণ। এই আসক্তি কেবল ব্যক্তিগত মানসিক স্বাস্থ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষাজীবন এবং কর্মক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবহারকারীরা প্রায়শই তাদের অনলাইন পরিচয়ের সাথে এতটাই জড়িয়ে পড়ে যে, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো তাদের কাছে গৌণ মনে হতে শুরু করে।

এই 'লাইক' সংস্কৃতিকে আরও জটিল করে তুলেছে প্ল্যাটফর্মগুলোর অন্তর্নিহিত অ্যালগরিদম। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীদের ডেটা বিশ্লেষণ করে তাদের পছন্দ, অপছন্দ, প্রবণতা এবং অনলাইন আচরণের একটি বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করে। এই প্রোফাইল ব্যবহার করে অ্যালগরিদমগুলো এমন কন্টেন্ট ব্যবহারকারীদের ফিডে প্রদর্শন করে, যা তাদের আরও বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট ধরনের কন্টেন্টে বেশি 'লাইক' দেন বা বেশি সময় ব্যয় করেন, তবে অ্যালগরিদম তাকে সেই ধরনের আরও কন্টেন্ট দেখাতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াটি এক ধরনের 'ইকো চেম্বার' বা 'ফিল্টার বাবল' তৈরি করে, যেখানে ব্যবহারকারীরা কেবল তাদের নিজস্ব মতামত বা পছন্দের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দেখতে পান, যা তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সংকীর্ণ করে তোলে এবং ভিন্নমতকে অসহিষ্ণু করে তোলে। এই অ্যালগরিদমগুলো এমনভাবে কাজ করে যে, ব্যবহারকারীরা প্রায়শই বুঝতেও পারেন না যে তাদের অনলাইন অভিজ্ঞতা কতটা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এটি শুধু কন্টেন্ট প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিজ্ঞাপনের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচার এবং এমনকি জনমত গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। World Bank এবং Asian Development Bank (ADB) সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ডিজিটাল ইকোনমি ও এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করছে, যেখানে এই অ্যালগরিদমিক প্রভাবগুলো বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডেটা সংগ্রহ ও অ্যালগরিদম ব্যবহারের নৈতিক দিকগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও গভীর আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা (কোটি) সাল বৃদ্ধির হার (%) দৈনিক গড় ব্যবহার (ঘণ্টা)
২.৫ ২০১৫ - ১.৫
৬.০ ২০১৮ ১৪০% ২.০
১০.৫ ২০২১ ৭৫% ২.৮
১২.২ ২০২৩ ১৬% ৩.৫

উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি 'ডিজিটাল ওয়েলবিং টাস্কফোর্স' গঠন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তি এবং অ্যালগরিদমিক প্রভাব সম্পর্কে নিয়মিত গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করতে পারে। এই টাস্কফোর্স আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন World Bank এবং ADB-এর ডিজিটাল ইকোনমি সংক্রান্ত নীতি ও সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে দেশের প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য আইন ও নীতি প্রণয়নে সহায়তা করবে।
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) কর্তৃক প্রণীত সিলেবাসে 'ডিজিটাল লিটারেসি' এবং 'মিডিয়া এথিক্স' অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গঠনগত দিক, অ্যালগরিদমের কার্যপ্রণালী এবং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষাদান করতে হবে, যাতে তারা সচেতন ব্যবহারকারী হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
  • BTRC-কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি 'ইউজার প্রটেকশন গাইডলাইন' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমিক স্বচ্ছতা এবং ব্যবহারকারীর ডেটা সুরক্ষার বিষয়ে কঠোর নিয়মাবলী থাকবে। এই গাইডলাইনে ব্যবহারকারীদের জন্য আসক্তি কমানোর টুলস (যেমন: স্ক্রিন টাইম লিমিট, নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ) যুক্ত করার বাধ্যবাধকতা এবং এর নিয়মিত নিরীক্ষার বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাদমান সাকিব

সাদমান সাকিব 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডস ও অ্যালগরিদম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator