সম্প্রতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ইলেকট্রিক ভেহিকল (ই-ভি) এর সংখ্যা প্রায় ৭,০০০ ছাড়িয়ে গেলেও, অনুমোদিত পাবলিক চার্জিং স্টেশন এর সংখ্যা এখনো পঞ্চাশের কোটা অতিক্রম করতে পারেনি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে, ই-ভি বিপ্লবের পথে বাংলাদেশ একটি অদৃশ্য অথচ প্রকট চার্জিং নেটওয়ার্ক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যা দেশের সবুজ জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই অপরিণত অবকাঠামো ই-ভি ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের ই-ভি চার্জিং নেটওয়ার্কের বর্তমান চিত্র হতাশাব্যঞ্জক। যদিও বাংলাদেশ সরকার 'ইলেকট্রিক ভেহিকল চার্জিং নির্দেশিকা-২০২২' প্রণয়ন করেছে, এর বাস্তবায়ন ধীর গতিতে চলছে। অধিকাংশ চার্জিং স্টেশন শহরাঞ্চল কেন্দ্রিক এবং প্রধান মহাসড়কগুলোতে এর উপস্থিতি নগণ্য। ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে ই-ভি ব্যবহারকারীরা পর্যাপ্ত চার্জিং সুবিধা না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা এবং প্রমিতকরণের অভাবে চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণে দ্বিধাগ্রস্ত। বিদ্যুতের গ্রিড সক্ষমতা এবং বিতরণ ব্যবস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। চার্জিং স্টেশনগুলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে ই-ভি ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন করা কঠিন হবে। এছাড়া, বিভিন্ন চার্জিং স্টেশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং পেমেন্ট পদ্ধতির জটিলতাও ব্যবহারকারীদের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা এই উদীয়মান খাতটির বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের দুর্বলতা। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় চার্জিং অবকাঠামো প্রসারের ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক রোডম্যাপ তৈরি হয়নি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এর এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ই-ভি এর সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার জন্য প্রয়োজন হবে অন্তত ৫,০০০ পাবলিক চার্জিং স্টেশন। কিন্তু বর্তমান গতিতে এই লক্ষ্য অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) বাংলাদেশের সবুজ পরিবহন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখালেও, পর্যাপ্ত নীতিগত সমর্থন এবং সুনির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাবনার অভাবে তাদের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যাচ্ছে না। ফলে, চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং আর্থিক প্রণোদনা প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যাচ্ছে, যা ই-ভি খাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করছে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রসারে বাধা দিচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের আমদানি নির্ভরতা কমানোর সরকারি লক্ষ্যকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
| সূচক | ২০২২ | ২০২৩ (আনুমানিক) | ২০২৫ (লক্ষ্য) |
|---|---|---|---|
| নিবন্ধিত ই-ভি সংখ্যা | ৪,৫০০ | ৭,২০০ | ২৫,০০০ |
| পাবলিক চার্জিং স্টেশন | ৩০ | ৫০ | ৫০০ |
| চার্জিং স্টেশন প্রতি ই-ভি অনুপাত | ১৫০:১ | ১৪৪:১ | ৫০:১ |
| বিদ্যুৎ সরবরাহ ক্ষমতা (মেগাওয়াট) | ০.৬ | ১.২ | ১০.০ |
উৎস: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) এর তথ্য বিশ্লেষণ।
সুপারিশ
- সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি 'ই-ভি চার্জিং অবকাঠামো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ' গঠন করতে হবে, যা 'ইলেকট্রিক ভেহিকল চার্জিং নির্দেশিকা-২০২২' এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে।
- বাংলাদেশ ব্যাংককে (Bangladesh Bank) ই-ভি চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য 'সবুজ অর্থায়ন' (Green Financing) নীতিমালার আওতায় সহজ শর্তে ঋণ ও বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে, যাতে দ্রুতগতিতে দেশব্যাপী একটি শক্তিশালী চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
- বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিগুলোকে ই-ভি চার্জিং স্টেশনগুলির জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং 'স্মার্ট গ্রিড' প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুতের লোড ব্যবস্থাপনা ও চার্জিং ট্যারিফকে ই-ভি ব্যবহারকারীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।