ফার্মা শিল্পের বৈশ্বিক কাঁচামাল সংকট: বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদনে নতুন চ্যালেঞ্জ ও কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফার্মা শিল্পের বৈশ্বিক কাঁচামাল সংকট: বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদনে নতুন চ্যালেঞ্জ ও কৌশল

ফারহান তানভীর  avatar   
ফারহান তানভীর
ফার্মা শিল্পের বৈশ্বিক কাঁচামাল সংকট: বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদনে নতুন চ্যালেঞ্জ ও কৌশল
ফার্মা শিল্পের বৈশ্বিক কাঁচামাল সংকট: বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদনে নতুন চ্যালেঞ্জ ও কৌশল
ছবি: সংগৃহীত

গত বছর বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আকস্মিক অস্থিরতা এবং চীনের কঠোর কোভিড-১৯ নীতিমালার কারণে প্যারাসিটামলের মূল উপাদান প্যারাসিটামল অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্র...

গত বছর বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আকস্মিক অস্থিরতা এবং চীনের কঠোর কোভিড-১৯ নীতিমালার কারণে প্যারাসিটামলের মূল উপাদান প্যারাসিটামল অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (API) এর আন্তর্জাতিক মূল্য প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা বাংলাদেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাৎক্ষণিক নতুন হিসাব কষতে বাধ্য করে। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (BAPI) এর তথ্যমতে, দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যারা মূলত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে সিদ্ধহস্ত, তারা এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিতে কাঁচামাল আমদানিতে বড় ধরনের সংকটে পড়ে। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক কাঁচামাল নির্ভরতার ভঙ্গুরতাকে স্পষ্ট করে তোলে এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্র তৈরি করে, যা শুধুমাত্র প্যারাসিটামলে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের কাঁচামালকেও প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বর্তমানে তার মোট চাহিদার প্রায় ৯৫% স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হলেও, এর প্রায় ৯০% কাঁচামালই আমদানি নির্ভর, যার সিংহভাগ আসে চীন ও ভারত থেকে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় চীনের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে এই নির্ভরশীলতা একটি গুরুতর সংকটে রূপ নেয়, যা অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধের উৎপাদন ব্যাহত করার উপক্রম করে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ওষুধের জন্য প্রয়োজনীয় API-এর সরবরাহ চরমভাবে বিঘ্নিত হয়েছিল। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর একটি অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২২ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রায় ৫০টিরও বেশি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের API আমদানিতে বিলম্ব ঘটে, যার ফলে স্থানীয় বাজারে কিছু ওষুধের সাময়িক ঘাটতি দেখা দেয় এবং উৎপাদন খরচ গড়ে ১৫-২০% বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যার ফলে ২০২৬ সালের পর পেটেন্টমুক্ত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের সুবিধা সীমিত হয়ে আসার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের ওষুধ শিল্পের জন্য আরও গভীর কৌশলগত পরিবর্তন দাবি করে।

এই সংকট মোকাবেলায় সরকার এবং ওষুধ উৎপাদনকারী উভয় পক্ষ থেকেই একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও, তা কাঁচামাল নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় ঔষধ নীতি ২০১৬' এবং 'জাতীয় ঔষধ নীতি ২০২১ (খসড়া)' এ API পার্ক স্থাপনের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হলেও, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় স্থাপিত API শিল্প পার্কের কাজ এখনও ধীর গতিতে চলছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (BSCIC) এর তত্ত্বাবধানে এই পার্কের কাজ শুরু হলেও, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের অপর্যাপ্ততা এবং বিনিয়োগকারীদের অনীহা এটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতে বাধা দিচ্ছে। উপরন্তু, স্থানীয়ভাবে API উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান, দক্ষ জনবল এবং বিপুল প্রাথমিক বিনিয়োগের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা একদিকে যেমন স্থানীয় উৎপাদকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে ওষুধের খুচরা মূল্যের উপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের উপর বর্তাচ্ছে। এমনকি ভ্যাকসিন উৎপাদনেও কাঁচামালের বৈশ্বিক সংকট প্রভাব ফেলছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এর বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, নতুন ভ্যাকসিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রিকার্সর কেমিক্যালস ও বায়োটেকনোলজিক্যাল কাঁচামাল আমদানি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

দেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতের ওষুধ উৎপাদনেও এই কাঁচামাল সংকট গভীর প্রভাব ফেলছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট এবং অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধের জন্য প্রয়োজনীয় API এর প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে এই কাঁচামালের দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হলে মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা এমনিতেই সীমিত, সেখানে ওষুধের সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) সম্প্রতি ঔষধ অধ্যাদেশ ১৯৬২ (সংশোধিত) এর কিছু ধারা প্রয়োগ করে স্থানীয়ভাবে API উৎপাদনে উৎসাহ দিতে শুল্ক সুবিধা ও অন্যান্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও, এর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এখনও পর্যবেক্ষণাধীন। স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন না হলে, দেশের ওষুধ শিল্প সম্পূর্ণরূপে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার শিকার হবে, যা দেশের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির উপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

API প্রকার আমদানি নির্ভরতা (%) (২০২২-২০২৩) মূল্য বৃদ্ধি (%) (২০২১-২০২২) শীর্ষ উৎস দেশ
প্যারাসিটামল ৯৫% ৩০% চীন
অ্যান্টিবায়োটিক (কিছু জেনারেশন) ৯০% ১৫-২৫% চীন, ভারত
ডায়াবেটিস (যেমন: মেটফর্মিন) ৮৮% ২০% চীন
হৃদরোগ (যেমন: অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন) ৯২% ১৮% ভারত
মানসিক স্বাস্থ্য (অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট) ৯৮% ২৫-৩০% চীন, ভারত

উৎস: বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (BAPI), ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এবং MOHFW এর বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩)।

সুপারিশ

  • গজারিয়ায় অবস্থিত API শিল্প পার্কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (BSCIC) কে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সকল ইউটিলিটি সংযোগ (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট স্থাপন সম্পন্ন করতে হবে। একই সাথে, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য 'জাতীয় ঔষধ নীতি ২০২১' এর আওতায় নির্দিষ্ট কর অবকাশ এবং সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিসিএসআইআর এর সাথে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এর যৌথ উদ্যোগে একটি গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) তহবিল গঠন করতে হবে। এই তহবিল থেকে স্থানীয়ভাবে অত্যাবশ্যকীয় API এবং বায়োটেকনোলজিক্যাল কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে, যা 'জাতীয় ঔষধ নীতি ২০১৬' এর গবেষণা ও উন্নয়ন অধ্যায়ের অধীনে বাস্তবায়িত হবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর সাথে সমন্বয় করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে মানসিক স্বাস্থ্য ওষুধের API এর জন্য একটি পৃথক কৌশলপত্র প্রণয়ন করতে হবে। এই কৌশলপত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ওষুধের জন্য অপরিহার্য কাঁচামালের সরবরাহ শৃঙ্খলকে বৈচিত্র্যময় করা এবং অন্তত দুটি বিকল্প উৎস দেশ থেকে আমদানির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হবে, যাতে কোনো একক দেশের উপর নির্ভরশীলতা কমানো যায় এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলা করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহান তানভীর

ফারহান তানভীর 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ওষুধ শিল্প ও আন্তর্জাতিক ফার্মা মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator