ওয়েব৩ গেমিংয়ের উত্থান: প্লে-টু-আর্ন মডেলের ভবিষ্যৎ কি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ওয়েব৩ গেমিংয়ের উত্থান: প্লে-টু-আর্ন মডেলের ভবিষ্যৎ কি?

সাজিদ মাহমুদ  avatar   
সাজিদ মাহমুদ
ওয়েব৩ গেমিংয়ের উত্থান: প্লে-টু-আর্ন মডেলের ভবিষ্যৎ কি?
ওয়েব৩ গেমিংয়ের উত্থান: প্লে-টু-আর্ন মডেলের ভবিষ্যৎ কি?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর যৌথ উদ্যোগে...

সম্প্রতি, বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক ওয়েবিনার থেকে জানা যায়, ২০২৭ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী ব্লকচেইন গেমিংয়ের বাজার মূল্য ৬১.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা ২০২২ সালে ছিল মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন ডলার। এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে, প্লে-টু-আর্ন (P2E) মডেলের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ওয়েব৩ গেমিং শুধুমাত্র একটি সাময়িক প্রবণতা নয়, বরং এটি ডিজিটাল অর্থনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, যেখানে খেলোয়াড়রা কেবল বিনোদনই নয়, বরং গেমিংয়ের মাধ্যমে বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্যও তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য, যেখানে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাধিক্য এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার হার ক্রমবর্ধমান, সেখানে এই মডেল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদি সঠিক নীতি এবং অবকাঠামোগত সমর্থন নিশ্চিত করা যায়।

ওয়েব৩ গেমিংয়ের মূল ভিত্তি হলো ব্লকচেইন প্রযুক্তি, যা গেমের মধ্যে থাকা সম্পদ (যেমন: চরিত্র, সরঞ্জাম, ভার্চুয়াল জমি) নন-ফাঞ্জিবল টোকেন (NFT) আকারে মালিকানা নিশ্চিত করে। এই NFT গুলো খেলোয়াড়দের সম্পূর্ণ মালিকানা প্রদান করে, যা প্রচলিত গেমিং মডেলের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে গেমের সম্পদগুলো গেমিং কোম্পানির কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে এবং খেলোয়াড়দের কেবল ব্যবহারের অধিকার থাকে। Axie Infinity, Decentraland এবং The Sandbox-এর মতো গেমগুলো ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডলারের লেনদেন ঘটিয়েছে, যেখানে খেলোয়াড়রা তাদের অর্জিত NFT গুলো ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিক্রি করে প্রকৃত অর্থ উপার্জন করছেন। এই মডেল বিশেষ করে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় অর্থনৈতিক সংকটের মুখে থাকা মানুষের জন্য আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) কর্তৃক ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত লেনদেনের উপর কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও, ব্লকচেইন ভিত্তিক গেমিংয়ের অন্তর্নিহিত প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য, যা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

প্লে-টু-আর্ন মডেলের ভবিষ্যৎ কেবল অর্থ উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি গেমিং ইকোসিস্টেমের মধ্যে খেলোয়াড়দের একটি শক্তিশালী কমিউনিটি এবং অংশীদারিত্বের অনুভূতি তৈরি করছে। গেমের অর্থনীতিতে খেলোয়াড়দের সরাসরি অংশগ্রহণ, ভোটিং অধিকার (DAO – Decentralized Autonomous Organization-এর মাধ্যমে) এবং গেমের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ ওয়েব২ গেমিংয়ের একমুখী মডেল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের আইসিটি ডিভিশন এবং অ্যাস্পায়ার টু ইনোভেট (a2i) প্রোগ্রামের মাধ্যমে ডিজিটাল উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যা ওয়েব৩ গেমিংয়ের বিকাশের জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক অথরিটি (BHTPA) বিভিন্ন হাই-টেক পার্ক এবং ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন করেছে, যা ব্লকচেইন এবং গেমিং স্টার্টআপগুলোকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং মেন্টরশিপ প্রদান করতে পারে। এই উদ্যোগগুলো যদি P2E মডেলের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা এবং আইনি বৈধতা পায়, তবে দেশের তরুণ ডেভেলপার এবং গেমাররা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারবে এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে। তবে, এই মডেলের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব এবং খেলোয়াড়দের বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি, কারণ ক্রিপ্টো বাজারের অস্থিরতা এবং গেমের টোকেনোমিক্সের ভারসাম্যহীনতা খেলোয়াড়দের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সূচক ২০২২ সাল ২০২৭ সালের পূর্বাভাস উৎস
ব্লকচেইন গেমিং বাজার মূল্য (বিলিয়ন USD) ৪.৬ ৬১.৪ MarketsandMarkets Research
P2E গেম ব্যবহারকারীর সংখ্যা (মিলিয়ন) ১.৫ ২০+ DappRadar, Crypto.com Research
NFT গেমিং লেনদেন (বিলিয়ন USD) ১.৬ ১৮.৫+ Statista, Blockchain Gaming Alliance

উৎস: MarketsandMarkets Research, DappRadar, Crypto.com Research, Statista, Blockchain Gaming Alliance.

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)-কে নিয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হোক, যারা প্লে-টু-আর্ন মডেলের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো (Regulatory Framework) তৈরি করবে, যা ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং NFT লেনদেনের বৈধতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং BTRC-এর সাথে সমন্বয় সাধন করবে।
  • অ্যাস্পায়ার টু ইনোভেট (a2i) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক অথরিটি (BHTPA) এর অধীনে ব্লকচেইন গেমিং স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ ইনকিউবেশন ও ফান্ডিং প্রোগ্রাম চালু করা হোক, যেখানে ট্যাক্স ইনসেনটিভ এবং আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন বিশেষজ্ঞদের মেন্টরশিপের ব্যবস্থা থাকবে, যাতে স্থানীয় ডেভেলপাররা বিশ্বমানের P2E গেম তৈরি করতে পারে।
  • সরকারের পক্ষ থেকে, বিশেষ করে ICT Division এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, NFT এবং ওয়েব৩ গেমিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য দেশব্যাপী কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হোক, যাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি এবং সুযোগ উভয় সম্পর্কেই খেলোয়াড় ও ডেভেলপাররা অবগত থাকে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাজিদ মাহমুদ

সাজিদ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator