সম্প্রতি, নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট এনআইডি) প্রদান প্রক্রিয়াকে আরও নিরবচ্ছিন্ন করতে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন নাগরিক সেবাকে দ্রুত ও নির্ভুল করবে, তেমনই অন্যদিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ডেটা সুরক্ষার বিষয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, বিটিআরসি-এর নতুন ডেটা সুরক্ষা বিধিমালা এবং প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের প্রেক্ষাপটে ফেসিয়াল রিকগনিশনের মতো বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নজরদারির সুবিধা বনাম গোপনীয়তার ঝুঁকির এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১ অর্জনে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কোনো বিকল্প নেই, এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন নিঃসন্দেহে সেই অগ্রগতির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। অপরাধ দমনে, সীমান্ত সুরক্ষায় এবং বিভিন্ন সরকারি সেবায় পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়ায় এই প্রযুক্তি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করতে, ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে এবং এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। ICT Division এর অধীনে বিভিন্ন প্রকল্পে, যেমন 'পরিচয়' প্ল্যাটফর্মে, ফেসিয়াল রিকগনিশনের প্রাথমিক প্রয়োগ দেখা গেছে, যা সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। তবে, এই প্রযুক্তির অপব্যবহারের সম্ভাবনাও প্রবল। সংগৃহীত বায়োমেট্রিক ডেটা যদি পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই সংরক্ষণ করা হয় অথবা তৃতীয় পক্ষের কাছে অননুমোদিতভাবে চলে যায়, তাহলে তা ব্যক্তির মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে গোপনীয়তার অধিকারকে মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করতে পারে। বিশেষ করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ (DSA) বাতিলের পর যখন নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ (CSA) নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন ডেটা সুরক্ষার আইনি কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। BASIS এবং BHTPA-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করলেও, ডেটা সুরক্ষার দিকটি প্রায়শই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির পরিধি কেবল সরকারি সেবায় সীমাবদ্ধ নয়, ব্যক্তিগত খাতেও এর ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যেমন ব্যাংক, ফিনটেক সংস্থা এবং এমনকি খুচরা বিক্রেতারাও গ্রাহক যাচাইকরণ এবং নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য এই প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। a2i (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) এর মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় বায়োমেট্রিক তথ্য সংযুক্ত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা একদিকে যেমন সেবাকে সহজলভ্য করছে, তেমনই অন্যদিকে ব্যবহারকারীর ডেটা সুরক্ষার প্রশ্ন উত্থাপন করছে। এই ডেটাগুলো কোথায়, কীভাবে এবং কতদিন ধরে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে স্বচ্ছতার অভাব প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়। ডেটা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তার প্রতিকার ব্যবস্থা কী হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কীভাবে তার অধিকার পুনরুদ্ধার করতে পারবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর আইন ও নীতিমালা এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে কঠোর ডেটা সুরক্ষা আইন (যেমন GDPR) রয়েছে, সেখানেও ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান। বাংলাদেশে, যেখানে ডিজিটাল অবকাঠামো দ্রুত বর্ধনশীল, সেখানে এই ধরনের সংবেদনশীল প্রযুক্তির ব্যবহারে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। ডেটা সুরক্ষা আইন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন এক নজরদারি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যেখানে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সর্বক্ষণ ট্র্যাক করা হবে।
| বছর/ক্ষেত্র | ডিজিটাল সেবায় ফেসিয়াল রিকগনিশনের ব্যবহার বৃদ্ধির হার (%) | সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা (আনুমানিক) | ডেটা সুরক্ষা আইন কার্যকারিতা সূচক (১-১০ স্কেল) |
|---|---|---|---|
| ২০২০ | ১৫% | ১২০০ | ৩.৫ |
| ২০২১ | ২৫% | ১৮৫০ | ৪.০ |
| ২০২২ | ৪০% | ২৭০০ | ৪.২ |
| ২০২৩ (প্রাক্কলিত) | ৫৫% | ৩৪০০ | ৪.৫ |
| সরকারি পরিচয় যাচাই | ৭০% | — | — |
| ফিনটেক খাত | ৩০% | — | — |
উৎস: বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (BCC), বিটিআরসি (BTRC) এবং বিভিন্ন সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- ফেসিয়াল রিকগনিশন ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'বায়োমেট্রিক ডেটা সুরক্ষা নীতিমালা' প্রণয়ন ও কার্যকর করা। এই নীতিমালায় অবশ্যই প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA)-এর অধীনে স্বতন্ত্র 'ডেটা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ' (Data Protection Authority) গঠনের বিধান থাকতে হবে, যা ডেটা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিকার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
- ICT Division এবং a2i-এর তত্ত্বাবধানে একটি জাতীয় 'ডেটা অডিট ও স্বচ্ছতা ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি করা, যেখানে ফেসিয়াল রিকগনিশন ডেটা ব্যবহারকারী সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত ডেটা সুরক্ষা অডিটের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এই ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে BASIS এবং BHTPA-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মান (যেমন ISO 27001) অনুসরণের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন প্রদান করবে।
- বিটিআরসি (BTRC) এর মাধ্যমে একটি জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন শুরু করা, যা ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার, এর সুবিধা ও ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষায় নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেবে। একই সাথে, নাগরিকদের ডেটা অপব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্য একটি সহজলভ্য ও কার্যকর 'অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া' (Grievance Redressal Mechanism) স্থাপন করা, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি (DSA)-এর অধীনে পরিচালিত হবে।