গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ: সাফল্যের গল্প নাকি অধরা স্বপ্ন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ: সাফল্যের গল্প নাকি অধরা স্বপ্ন?

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ: সাফল্যের গল্প নাকি অধরা স্বপ্ন?
গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ: সাফল্যের গল্প নাকি অধরা স্বপ্ন?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০২২' এর খসড়ায় গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ...

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০২২' এর খসড়ায় গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগটি একদিকে যেমন দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে ত্বরান্বিত করার ইঙ্গিত দেয়, তেমনই প্রশ্ন জাগায় বেসরকারি বিনিয়োগের প্রকৃত চিত্র নিয়ে। যদিও বিগত এক দশকে শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান সংশ্লিষ্ট R&D খাতে সরকারি বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, বেসরকারি অংশগ্রহণ এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BANBEIS) তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা খাতে গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি পেলেও, শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল খুবই সীমিত। এই পরিস্থিতি কি R&D খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকে কেবল একটি অধরা স্বপ্নে পরিণত করছে, নাকি এটি সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা ধারণ করে?

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে R&D কার্যক্রমের গতিশীলতা এবং এর সাথে বেসরকারি খাতের সম্পর্ক একটি জটিল সমীকরণে বাঁধা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল মূলত সরকারি উৎস থেকেই আসে। হাতে গোনা কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিল্প-প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে গবেষণা কার্যক্রমে অর্থায়ন করলেও, তা দেশের সামগ্রিক R&D ল্যান্ডস্কেপের তুলনায় নগণ্য। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর অধীনে পরিচালিত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতেও অত্যাধুনিক গবেষণাগার এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের অভাব প্রকট। যদিও শিল্প-শিক্ষা সংযোগ (Industry-Academia Linkage) প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, বাস্তবে এই সংযোগের মাধ্যমে গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন, যৌথ গবেষণা উদ্যোগ বা মেধাস্বত্ব (IP) ভাগাভাগির দৃষ্টান্ত খুবই কম। এর ফলে, অনেক গবেষণা ফলাফল কেবল অ্যাকাডেমিক প্রকাশনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়।

দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে R&D এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ সরকার দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো 'Skills for Employment Investment Program (SEIP)'। SEIP প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে, এই প্রকল্পগুলোতে মূলত প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা উৎপাদন প্রক্রিয়ার R&D তে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও অপ্রতুল। অনেক ক্ষেত্রে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণে আগ্রহী হলেও, দীর্ঘমেয়াদী ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গবেষণা প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে দ্বিধাগ্রস্ত। এর একটি কারণ হতে পারে গবেষণার ফলাফল থেকে দ্রুত বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং মেধাস্বত্বের সুরক্ষা নিয়ে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা। এছাড়া, R&D কার্যক্রমে বিনিয়োগের জন্য কর প্রণোদনা বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা এখনো ততটা আকর্ষণীয় নয়, যা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২
উচ্চশিক্ষায় গবেষণা অনুদান (কোটি টাকা) - UGC ৩৫০ ৪১০ ৪৮০
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক R&D বিনিয়োগ (কোটি টাকা) ৩০ ৩৫ ৪২
শিল্প-প্রতিষ্ঠানের R&D খাতে সরাসরি বিনিয়োগ (কোটি টাকা) ১২ ১৪ ১৭
SEIP এর আওতায় বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৪৫ ১৬০ ১৮৫
জাতীয় জিডিপিতে R&D ব্যয়ের শতাংশ (BANBEIS ও অন্যান্য) ০.৪৫% ০.৪৬% ০.৪৭%

উৎস: UGC বার্ষিক প্রতিবেদন, BANBEIS, NSDA, SEIP প্রতিবেদন (বিভিন্ন সাল)

সুপারিশ

  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক 'গবেষণা ও উন্নয়ন কর প্রণোদনা আইন' প্রণয়ন করা উচিত, যেখানে R&D খাতে বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমপক্ষে ১৫০% কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধিতে উৎসাহিত হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং NSDA এর যৌথ উদ্যোগে 'জাতীয় R&D ফান্ড' গঠন করা উচিত, যেখানে বেসরকারি খাতের জন্য ম্যাচিং গ্রান্ট (Matching Grant) এর ব্যবস্থা থাকবে। এই ফান্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর অধীনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে শিল্প-প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণা প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থায়ন করা হবে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও বাণিজ্যিকীকরণ নীতিমালা' হালনাগাদ করা উচিত, যেখানে গবেষণার ফলাফল থেকে প্রাপ্ত মেধাস্বত্ব (Intellectual Property Rights) এর মালিকানা, ভাগাভাগি এবং বাণিজ্যিকীকরণের সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা হবে। এটি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের R&D কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং উদ্ভাবনের বাণিজ্যিকীকরণে আস্থা বাড়াবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator