সম্প্রতি, পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রধান বাজার, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কার কারণে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা মন্থর হয়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর খুচরা বিক্রির মন্দাবস্থাকেই নির্দেশ করে। এই পরিস্থিতি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে নতুন ক্রেতা এবং বাজারের সন্ধানে অধিকতর মনোযোগী হতে বাধ্য করছে, বিশেষ করে যখন প্রচলিত বাজারগুলোতে চাহিদার ওঠানামা স্পষ্ট। এই সংকটকালে, কেবল প্রচলিত ক্রেতাদের উপর নির্ভর না করে, কীভাবে বহুমুখী বাজার কৌশল অবলম্বন করে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায়, তা নিয়ে শিল্প সংশ্লিষ্ট এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর আলোচনা চলছে।
পশ্চিমা বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথে সৃষ্ট জটিলতা শিপিং খরচ বৃদ্ধি ও পণ্যের ডেলিভারি সময় দীর্ঘায়িত করছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এর ফলে অনেক পশ্চিমা ক্রেতা বিকল্প উৎস বা ভৌগোলিকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ সরবরাহকারী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা ক্রেতাদের মধ্যে 'চায়না প্লাস ওয়ান' বা 'ভিয়েতনাম প্লাস ওয়ান' নীতি গ্রহণের প্রবণতা বাড়লেও, বাংলাদেশ এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। এর কারণ হিসেবে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বন্দর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘসূত্রতা এবং কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। নতুন ক্রেতা আকৃষ্ট করতে হলে শুধু মূল্য প্রতিযোগিতা নয়, বরং দ্রুত ডেলিভারি, মানসম্পন্ন পণ্য এবং পরিবেশগত ও সামাজিক কমপ্লায়েন্সে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার সক্ষমতা অপরিহার্য। পাশাপাশি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ক্রেতাদের (SMEs) উপর মনোযোগ বাড়ানো যেতে পারে, যারা বড় ব্র্যান্ডগুলোর মতো বৃহৎ অর্ডার না দিলেও, স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য হতে পারে। এই ধরনের ক্রেতাদের জন্য বিশেষায়িত পণ্য (niche products) তৈরি এবং দ্রুত ফ্যাশন (fast fashion) সরবরাহ করার সক্ষমতা বৃদ্ধি নতুন বাজার তৈরিতে সহায়ক হবে।
নতুন ক্রেতা খোঁজার কৌশল হিসেবে পশ্চিমা বাজারের বাইরে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পোশাক আমদানিতে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখাচ্ছে। জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, সঠিক কৌশল ও পণ্যের বৈচিত্র্য আনলে অ-প্রচলিত বাজারেও সাফল্য অর্জন সম্ভব। তবে এই বাজারগুলোতে প্রবেশ করতে হলে পণ্যের ডিজাইন, আকার (sizing) এবং সাংস্কৃতিক পছন্দ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতাদের জন্য ইসলামিক ফ্যাশন বা নির্দিষ্ট ডিজাইনের পোশাক তৈরি করা যেতে পারে, যা পশ্চিমা ক্রেতাদের চাহিদা থেকে ভিন্ন। এছাড়াও, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর কৌশলও কার্যকর হতে পারে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত ফিনটেক কোম্পানিগুলো রপ্তানিকারকদের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন সহজ করতে পারে, যা ছোট আকারের ক্রেতাদের সাথে লেনদেনে সহায়ক হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (FTA) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA) নিয়ে কাজ করছে, যা শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করবে। এই চুক্তিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন এবং কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি খাত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে।
| অর্থবছর | মোট পোশাক রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | অ-পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | অ-পশ্চিমা বাজারে প্রবৃদ্ধি (%) |
|---|---|---|---|---|
| ২০২০-২১ | ৩১.৪৬ | ২৫.২০ | ৬.২৬ | ১০.৫ |
| ২০২১-২২ | ৪২.৬১ | ৩৪.৮৫ | ৭.৭৬ | ২৩.৯ |
| ২০২২-২৩ | ৪৬.৯৯ | ৩৮.৫০ | ৮.৪৯ | ৯.৪ |
| ২০২৩-২৪ (জুলাই-নভেম্বর) | ১৯.৩০ | ১৫.৮০ | ৩.৫০ | ১২.৬ |
উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর বিশ্লেষণ
সুপারিশ
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে জাপানের সাথে বিদ্যমান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) এবং কানাডার সাথে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) এর আলোচনার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে, যাতে নতুন বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়।
- NBR (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) কে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিদ্যমান শুল্ক ও কর সুবিধাগুলোকে আরও সহজ ও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য 'জাতীয় রাজস্ব আইন' (National Revenue Act) এর অধীনে একটি বিশেষ 'রপ্তানি সহায়তা ইউনিট' গঠন করতে হবে, যা দ্রুত শুল্ক প্রত্যর্পণ এবং কর ছাড় সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করবে।
- EPB এবং BSEC কে যৌথভাবে একটি 'ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস ও বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম' তৈরি করতে হবে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্তি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সাথে সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করবে, এবং এর জন্য 'স্টার্টআপ বাংলাদেশ' নীতিমালার আওতায় বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করতে হবে।