পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাংলাদেশের অপ্রচলিত বাজার: রপ্তানি বহুমুখীকরণের নতুন দিশা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাংলাদেশের অপ্রচলিত বাজার: রপ্তানি বহুমুখীকরণের নতুন দিশা

মেহেদী হাসান  avatar   
মেহেদী হাসান
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাংলাদেশের অপ্রচলিত বাজার: রপ্তানি বহুমুখীকরণের নতুন দিশা
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাংলাদেশের অপ্রচলিত বাজার: রপ্তানি বহুমুখীকরণের নতুন দিশা
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক রাশিয়া ও এর মিত্রদের উপর আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি বাজারগুলোতে সৃ...

সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক রাশিয়া ও এর মিত্রদের উপর আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি বাজারগুলোতে সৃষ্ট অস্থিরতা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে এক নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে, বাংলাদেশের শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্য যেমন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলিতে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে আসলেও, অপ্রচলিত বাজারগুলোতে, বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিতে, রপ্তানি আয় ২১ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। এই তথ্য স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা কেবল একটি নীতিগত আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বাস্তবায়নের এক নতুন দিশা উন্মোচন করছে, যা দেশের অর্থনীতিকে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা থেকে সুরক্ষার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারে।

ঐতিহ্যগতভাবে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যার সিংহভাগ বাজার পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়া, জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পশ্চিমা দেশগুলির ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের চাহিদা কমেছে। এই পরিস্থিতিতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত রপ্তানি বহুমুখীকরণ কৌশল, যা নতুন পণ্য এবং নতুন বাজার অন্বেষণের উপর জোর দেয়, তা এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। অপ্রচলিত বাজারগুলিতে বাংলাদেশের পণ্য, বিশেষ করে ঔষধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং আইটি সেবাগুলির চাহিদা বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে ফার্মাসিউটিক্যালস এবং হালাল পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একইসাথে, আফ্রিকান দেশগুলিতে স্বল্প মূল্যের তৈরি পোশাক এবং কৃষি পণ্যের একটি বিশাল বাজার রয়েছে যা এখনও সম্পূর্ণভাবে অনাবিষ্কৃত। এই বাজারগুলোতে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর জন্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA/FTA) স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অপ্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানি বৃদ্ধি পেলেও, এর পরিমাণ এখনও মোট রপ্তানি আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ। এর প্রধান কারণ হলো, এই বাজারগুলোতে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, লজিস্টিক সহায়তা এবং বাজার গবেষণার অভাব। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, অপ্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানি বাড়াতে হলে পণ্য বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বাজার নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের মানোন্নয়ন এবং ব্র্যান্ডিং-এ বিনিয়োগ অত্যাবশ্যক। Furthermore, অপ্রচলিত বাজারগুলিতে লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রায়শই ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রায় বা ভিন্ন কোনো স্থিতিশীল মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ থাকে, যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ডলারের উপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর মাধ্যমে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পে নতুন প্রযুক্তি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিও এই বহুমুখীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধুমাত্র রপ্তানি বৃদ্ধি করবে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করবে। উদাহরণস্বরূপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, সিরামিক এবং বাইসাইকেলের মতো পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, যা আমাদের রপ্তানি ঝুড়িকে আরও সমৃদ্ধ করছে।

অর্থবছর মোট রপ্তানি আয় (বিলিয়ন USD) অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি আয় (বিলিয়ন USD) অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি (%) প্রধান অপ্রচলিত বাজার
২০২০-২১ ৩৮.৭৬ ৪.১২ ১৪.৫ জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া
২০২১-২২ ৫২.০৮ ৫.৩৭ ৩০.৩ জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, চীন
২০২২-২৩ ৫৫.৫৬ ৬.৫১ ২১.২ জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং EPB-কে অপ্রচলিত বাজারগুলোতে প্রবেশের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজার গবেষণা ও চাহিদার ভিত্তিতে পণ্য বৈচিত্র্যকরণের জন্য একটি ‘একশন প্ল্যান’ তৈরি করতে হবে এবং এর বাস্তবায়নে প্রতি বছর নূন্যতম ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে, যেখানে অপ্রচলিত বাজারের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণে সহায়তা প্রদান করা হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য শুল্ক-কর সংক্রান্ত নীতিমালায় বিশেষ ছাড় ও সহজীকরণ নিশ্চিত করতে হবে, যেমন – রপ্তানির বিপরীতে দ্রুত শুল্ক প্রত্যর্পণ (Duty Drawback) এবং রপ্তানি ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম (ECGS) এর আওতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা মূলধন সংকটে না পড়ে।
  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যৌথভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অপ্রচলিত বাজার-কেন্দ্রিক রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদী কর অবকাশ (Tax Holiday) এবং সহজ শর্তে বৈদেশিক মুদ্রা রূপান্তরের সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মেহেদী হাসান

মেহেদী হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator