সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূলে অনুমোদিত মাত্রার অতিরিক্ত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ (pesticide residue) পাওয়া যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি। বিশেষ করে, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় ৪০% সবজি এবং ৩৫% ফলের নমুনায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমা (Maximum Residue Limit - MRL) অতিক্রমকারী কীটনাশকের উপস্থিতি বিদ্যমান। এই উদ্বেগজনক চিত্র শুধু রাজধানী কেন্দ্রিক নয়, বরং দেশের অধিকাংশ কৃষিজমির বাস্তবতাকে তুলে ধরে, যেখানে নির্বিচার রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার খাদ্য নিরাপত্তার মৌলিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদী জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করছে, যা ক্যান্সার, কিডনি রোগ এবং স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতার মতো মারাত্মক ব্যাধিসমূহের প্রকোপ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
কৃষিজমিতে কীটনাশকের অবাধ ব্যবহারের মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো কৃষকদের মধ্যে সঠিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) যদিও মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদানের কাজ করে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকরা কখন, কোন মাত্রায় এবং কোন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য পান না। ফলে, অধিক ফলনের আশায় অথবা রোগবালাই দমনের সহজ উপায় হিসেবে তারা যথেচ্ছভাবে কীটনাশক প্রয়োগ করেন, যা শুধু মাটির উর্বরতা হ্রাস করে না, বরং উপকারী পোকামাকড়কেও ধ্বংস করে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। বাজারের সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক কম দামে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক প্রাপ্তিও এর একটি প্রধান কারণ। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিষিদ্ধ কীটনাশক বিক্রি করছে অথবা অনুমোদিত কীটনাশকের মোড়কে ভেজাল পণ্য সরবরাহ করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি যদিও নতুন জাত উদ্ভাবন এবং সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা (Integrated Pest Management - IPM) নিয়ে কাজ করছে, তবে এই উদ্ভাবনগুলির কার্যকর সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের কাছে পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
জনস্বাস্থ্যের উপর কীটনাশকের এই লাগামহীন ব্যবহারের সুদূরপ্রসারী প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। খাদ্যচক্রে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ প্রবেশ করে এটি মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদী বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এর মতে, কীটনাশকের দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শে আসার ফলে এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের ব্যাঘাত, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস এবং জন্মগত ত্রুটির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে, শিশুরা এবং গর্ভবতী নারীরা এই ধরনের দূষিত খাদ্যের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। কৃষকরা যারা সরাসরি কীটনাশক প্রয়োগের সাথে জড়িত, তারা আরও বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। সঠিক সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার না করার কারণে তারা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, চর্মরোগ এবং অন্যান্য নিউরোলজিক্যাল রোগের শিকার হন। কৃষি মন্ত্রণালয় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন নীতি ও আইন প্রণয়ন করলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন ও তদারকি দুর্বল। খাদ্যদ্রব্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং দক্ষ জনবলের অভাবও একটি বড় বাধা। এর ফলে, ভোক্তারা অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর একটি বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে।
| ফসলের ধরন | পরীক্ষিত নমুনার সংখ্যা | MRL অতিক্রমকারী নমুনার শতাংশ | গবেষণার সময়কাল |
|---|---|---|---|
| শাকসবজি (পাতাকপি, বেগুন, টমেটো) | ২৫০ | ৪০% | ২০২০-২০২২ |
| ফল (আম, কলা, পেঁপে) | ২০০ | ৩৫% | ২০২০-২০২২ |
| ধান (চাল) | ১৫০ | ১৫% | ২০২০-২০২২ |
| মাছ ও চিংড়ি | ১০০ | ২০% | ২০২০-২০২২ |
উৎস: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন, ২০২৩।
সুপারিশ
- কৃষি মন্ত্রণালয়কে 'সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা (IPM) নীতি' কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং DAE এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের জন্য নিয়মিত, নিবিড় ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যেখানে BARC এবং BARI কর্তৃক উদ্ভাবিত জৈব বালাইনাশক ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো হবে।
- বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে (BFSA) শক্তিশালী করতে হবে এবং খাদ্যপণ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করার জন্য সারাদেশে পর্যাপ্ত অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন ও দক্ষ জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে 'নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩' এর বিধান অনুযায়ী বাজারজাতকৃত পণ্যের নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ ও দূষণ পরীক্ষা করা যায়।
- সরকারকে 'কীটনাশক অধ্যাদেশ, ১৯৭১' এবং 'কীটনাশক বিধিমালা, ১৯৮৫' এর আধুনিকায়ন করে নিষিদ্ধ কীটনাশকের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং BRRI সহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি পদ্ধতির উপর গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।