ডেটা ও বাস্তবতা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

তানজিম আহমেদ  avatar   
তানজিম আহমেদ
ডেটা ও বাস্তবতা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় ই-স্পোর্টস নীতিমালা ২০২৪'-এর খসড়া দেশের গেমিং শিল্প মহলে ব্যাপক আলো...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় ই-স্পোর্টস নীতিমালা ২০২৪'-এর খসড়া দেশের গেমিং শিল্প মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো ই-স্পোর্টসকে একটি স্বীকৃত ক্রীড়া খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং এই খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। বৈশ্বিকভাবে যেখানে ই-স্পোর্টস এবং গেমিং ইন্ডাস্ট্রি ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার স্পর্শ করেছে, সেখানে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ করে দিয়েছে। বিশেষ করে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) সহ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারে যে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তার প্রেক্ষাপটে এই নীতিগত পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী।

ই-স্পোর্টস খাত কেবল বিনোদন বা খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র তৈরি করেছে, যেখানে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, হার্ডওয়্যার উৎপাদন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, মিডিয়া সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পরিষেবা অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বব্যাপী গেমিং খাতের রাজস্ব আয় প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং জিডিপিতে অবদান রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, গ্লোবাল ই-স্পোর্টস ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক ই-স্পোর্টস বাজার প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে এর আকার ২.৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি শুধুমাত্র খেলাধুলার জনপ্রিয়তার কারণে নয়, বরং গেম ডেভেলপমেন্ট স্টুডিও, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং গেমিং হার্ডওয়্যার নির্মাতাদের উদ্ভাবনী প্রচেষ্টার ফল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, স্থানীয় গেম ডেভেলপারদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা গেলে এই খাতের প্রবৃদ্ধি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলি একটি কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করবে, যা স্থানীয় স্টার্টআপ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

তবে, এই সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। ই-স্পোর্টস এবং গেমিং খাতের দ্রুত বিকাশের জন্য প্রয়োজন আধুনিক অবকাঠামো, উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং দক্ষ জনশক্তি। World Bank-এর 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' কর্মসূচির আওতায় গৃহীত প্রকল্পগুলো দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা গেমিং খাতের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। তবে, গেমিংয়ের মতো উচ্চ-ব্যান্ডউইথ নির্ভর কার্যকলাপের জন্য আরও নিরবচ্ছিন্ন এবং সাশ্রয়ী ইন্টারনেট অ্যাক্সেস নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এছাড়া, এই খাতের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত দক্ষতা যেমন – গেম ডিজাইনার, ডেভেলপার, ই-স্পোর্টস ইভেন্ট ম্যানেজার এবং ব্রডকাস্টার তৈরি করতে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। ADB (Asian Development Bank) বিভিন্ন দেশের যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নে যে সহায়তা প্রদান করে, তার আদলে বাংলাদেশেও গেমিং ও ই-স্পোর্টস সম্পর্কিত পেশাদার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটি কেবল যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না, বরং দেশের মেধাকে আন্তর্জাতিক গেমিং বাজারে তুলে ধরতে সাহায্য করবে। বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সমন্বয় করে গেমিং স্টাডিজ বা ই-স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের মতো নতুন কোর্স চালু করা যেতে পারে, যা এই খাতের ভবিষ্যত নেতৃত্ব তৈরি করবে।

বছর বৈশ্বিক গেমিং বাজার আয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বৈশ্বিক ই-স্পোর্টস বাজার আয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (মিলিয়ন)
২০২০ ১৫৯.৩ ১.০৫ ১০০.২
২০২১ ১৮০.৩ ১.১৩ ১১২.৭
২০২২ ১৮৪.৪ ১.৩৮ ১১৮.৬
২০২৩ (আনুমানিক) ১৯০.১ ১.৬২ ১২৫.৪
২০২৭ (প্রক্ষেপণ) ২৪৯.১ ২.৪৫ --

উৎস: Newzoo, Statista, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), Global Esports Forum।

সুপারিশ

  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-এর অধীনে একটি 'জাতীয় ই-স্পোর্টস উন্নয়ন তহবিল' গঠন করা হোক, যা স্থানীয় গেম ডেভেলপমেন্ট স্টুডিও এবং ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্ট আয়োজকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করবে। এই তহবিল পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সাথে সমন্বয় করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ-এর যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলিতে গেম ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট, ই-স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট এবং ডিজিটাল মিডিয়া প্রোডাকশন সম্পর্কিত বিশেষায়িত ডিপ্লোমা ও স্নাতক কোর্স চালু করা হোক। এক্ষেত্রে World Bank-এর মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়তাকারী প্রকল্পগুলোর কাঠামো অনুসরণ করা যেতে পারে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, গেমিং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার আমদানিতে শুল্ক সুবিধা প্রদান এবং স্থানীয়ভাবে গেম ডেভেলপমেন্টকে উৎসাহিত করার জন্য কর রেয়াত বা ভ্যাট ছাড়ের মতো প্রণোদনা ঘোষণা করুক, যা এই খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিম আহমেদ

তানজিম আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-স্পোর্টস (eSports) ও গেমিং ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator