জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈশ্বিক শান্তি কি শুধুই কাগজে?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈশ্বিক শান্তি কি শুধুই কাগজে?
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার, বৈশ্বিক শান্তি কি শুধুই কাগজে?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরায়েল-হামাস সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাসের ক্ষেত্রে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের নজিরবিহীন ঘটনা...

সম্প্রতি ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরায়েল-হামাস সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাসের ক্ষেত্রে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের নজিরবিহীন ঘটনা বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অঙ্গীকার নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে, মানবিক যুদ্ধবিরতি এবং সংঘাত নিরসনে বারবার যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগ, যা ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত তিনটি এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবকে অকার্যকর করেছে, স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদে অন্তর্ভুক্ত এই ক্ষমতা এখন আর কেবল 'গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ' রক্ষার হাতিয়ার নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানকেই বিলম্বিত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থার প্রতি বিশ্বের আস্থা ক্ষুণ্ণ করছে, যা বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে অন্তঃসারশূন্য করে তোলার ঝুঁকিতে ফেলেছে।

জাতিসংঘের ভেটো ক্ষমতা, যা মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে ডিজাইন করা হয়েছিল, বর্তমানে এর মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। গত এক দশকে, বিশেষ করে সিরিয়া, ইউক্রেন এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভেটো প্রয়োগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের সমন্বয়ে গঠিত এই পঞ্চশক্তির ভেটো প্রয়োগের কারণে প্রায়শই এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো আটকে যায়, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন, যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যা প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেন সংকটের শুরু থেকে রাশিয়া কর্তৃক একাধিক প্রস্তাবের ভেটো, বিশেষ করে ২০২২ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে আনা খসড়া প্রস্তাবে ভেটো, আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একইসাথে, সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার এবং মানবিক সাহায্য প্রবেশের বিষয়ে চীনের ভেটো প্রয়োগও প্রমাণ করে যে, ভেটো ক্ষমতা এখন আর কেবল আত্মরক্ষার ঢাল নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজ নিজ ভূ-রাজনৈতিক মিত্রদের রক্ষা করার একটি কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা জাতিসংঘের মূলনীতি 'সকল সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা' ধারণার পরিপন্থী। এর ফলে, অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবনহানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুরাহা না পেয়ে আরও জটিল রূপ ধারণ করছে।

ভেটো ক্ষমতার এই অপব্যবহারের প্রভাব শুধু নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখন জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বে অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন আঞ্চলিক জোটগুলোও তাদের কার্যকারিতা হারাতে শুরু করে অথবা তাদের মধ্যে নতুন বিভাজন তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, সার্ক (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) এবং BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এর মতো সংস্থাগুলো তাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য গঠিত হলেও, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাবে তাদের কার্যকারিতা প্রায়শই বাধাগ্রস্ত হয়। যখন বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আইনের সর্বজনীন প্রয়োগকে ব্যাহত করে, তখন আঞ্চলিক পর্যায়েও দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত হয়, যা আঞ্চলিক সংঘাত নিরসন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দীর্ঘকাল ধরে জাতিসংঘের সংস্কার, বিশেষ করে ভেটো ক্ষমতা সীমিত করার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে, কারণ বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশ UN Peacekeeping মিশনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখলেও, ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার তাদের প্রচেষ্টাকে ম্লান করে দেয়। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান উল্লেখযোগ্য; ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৬৪ জন শান্তিরক্ষী বিভিন্ন মিশনে পাঠিয়েছে, যা এই ভেটো ক্ষমতার অকার্যকরতার মধ্যেও শান্তিরক্ষার প্রতি তাদের অঙ্গীকার প্রমাণ করে। কিন্তু, যখন সংঘাতের উৎসস্থলে রাজনৈতিক সমাধান ভেটোর কারণে আটকে যায়, তখন শান্তিরক্ষীদের জীবন এবং তাদের অর্জিত সাফল্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

বিষয়বস্তু সময়কাল ভেটো প্রয়োগের সংখ্যা প্রধান ভেটো প্রয়োগকারী দেশ(সমূহ) প্রভাবিত অঞ্চল/সংঘাত
সিরিয়া সংক্রান্ত প্রস্তাব ২০১১-২০২৩ ১৬ রাশিয়া, চীন সিরিয়া গৃহযুদ্ধ, মানবিক সাহায্য, রাসায়নিক অস্ত্র
ইউক্রেন সংক্রান্ত প্রস্তাব ২০১৪-২০২৪ রাশিয়া ক্রিমিয়া সংযুক্তি, ইউক্রেন আগ্রাসন, যুদ্ধাপরাধ তদন্ত
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংক্রান্ত প্রস্তাব ১৯৭০-২০২৪ ৫৭ (এর মধ্যে ২০২৩-২৪ এ ৫টি) যুক্তরাষ্ট্র আরব-ইসরায়েল সংঘাত, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, মানবিক যুদ্ধবিরতি
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০০৪-২০২০ চীন, রাশিয়া সুদান, মিয়ানমার, আন্তর্জাতিক বিচার
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ১৯৬৫-২০২৩ ০ (তবে স্থায়ী সদস্যদের অনীহা) স্থায়ী সদস্যরা পরোক্ষভাবে নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা ও প্রতিনিধিত্ব

উৎস: UN Security Council Veto List (UN Dag Hammarskjöld Library), SIPRI, Council on Foreign Relations.

সুপারিশ

  • জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে 'দায়িত্বশীলতা কোড অব কন্ডাক্ট' (Code of Conduct regarding Security Council action against genocide, crimes against humanity or war crimes) বাস্তবায়ন করা। এই কোড অব কন্ডাক্ট অনুযায়ী, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর পরিস্থিতিতে স্থায়ী সদস্যরা ভেটো প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে একটি স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার করবে।
  • জাতিসংঘ সনদের ১০৮ এবং ১০৯ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা সীমিত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা-ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করা। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC ও সার্ক-এর মতো জোটের প্রতিনিধিদের পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য একটি দ্বৈত সংখ্যাগরিষ্ঠতার (Double Majority) ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে, যেখানে স্থায়ী সদস্যদের পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্যদেরও ভোটের প্রয়োজন হবে।
  • আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (International Court of Justice - ICJ) রায় এবং সুপারিশগুলো মেনে চলার জন্য একটি বাধ্যতামূলক কাঠামো তৈরি করা। বিশেষ করে, যেসকল ক্ষেত্রে ICJ কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে, সেই ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ সীমিত করার জন্য একটি বিশেষ প্রোটোকল তৈরি করা, যা আন্তর্জাতিক আইনকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা দেবে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণে সহজ হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator