সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুসারে, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা খাতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও বেসরকারি বিনিয়োগের চিত্র এখনো হতাশাজনক। যেখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি গবেষণা অনুদান পাচ্ছে, সেখানে বেসরকারি খাত থেকে এই খাতে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো নগণ্য, যা দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিসংখ্যান দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও বাস্তবতার মধ্যে বিদ্যমান বিশাল ব্যবধানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমশ জ্ঞানভিত্তিক সমাজের দিকে ধাবিত হলেও, R&D খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের অভাব দীর্ঘমেয়াদী টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করছে। যদিও সরকার বিভিন্ন নীতি সহায়তার মাধ্যমে গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে, যেমন – জাতীয় শিল্পনীতিতে R&D কে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা, কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগ এখনো সীমিত। শিল্প-শিক্ষাঙ্গন সংযোগের দুর্বলতা এই ব্যবধানের একটি মূল কারণ। দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলো সাধারণত তাদের নিজস্ব R&D ল্যাবরেটরি স্থাপনে অনীহা দেখায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর তথ্যমতে, শিল্প-কারখানা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে R&D সংক্রান্ত যৌথ প্রকল্প বা অর্থায়নের সংখ্যা হাতেগোনা। ফলস্বরূপ, গবেষণাগুলো প্রায়শই একাডেমিক জার্নালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাণিজ্যিকীকরণ বা শিল্প-প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এই বাস্তবতার কারণে দেশের উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হতে পারছে না, যা নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য উৎপাদনে পিছিয়ে রাখছে।
এই ব্যবধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে অসামঞ্জস্য। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) এবং স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি)-এর মতো সংস্থাগুলো দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করলেও, R&D খাতের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ও উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন গবেষক ও প্রকৌশলীর অভাব প্রকট। বেসরকারি বিনিয়োগের অভাবে অত্যাধুনিক গবেষণা অবকাঠামো এবং উচ্চমানের ল্যাবরেটরি স্থাপনেও ঘাটতি দেখা যায়, যা তরুণ গবেষকদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রায়শই উন্নত সুযোগ-সুবিধার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান। দেশের বৃহৎ পোশাক, ঔষধ বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মতো শিল্পগুলো যদিও নিজস্বভাবে কিছু গবেষণা করে, কিন্তু তা মূলত পণ্য উন্নয়ন বা প্রক্রিয়া উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, মৌলিক গবেষণায় তাদের বিনিয়োগ অত্যন্ত কম। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে জিডিপির ২-৩% R&D খাতে ব্যয় হয়, তার একটি বড় অংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। সেখানে বাংলাদেশের এই খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এখনো ১% এর নিচে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতার জন্য অশনি সংকেত।
| সাল | মোট R&D ব্যয় (কোটি টাকা) | বেসরকারি খাতের অবদান (কোটি টাকা) | বেসরকারি খাতের শতকরা হার (%) | উৎস |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৮ | ১,১০০ | ১১০ | ১০.০০% | BANBEIS |
| ২০১৯ | ১,২৩০ | ১২৫ | ১০.১৬% | BANBEIS |
| ২০২০ | ১,৪০০ | ১৪৫ | ১০.৩৫% | BANBEIS |
| ২০২১ | ১,৫৫০ | ১৫৫ | ১০.০০% | UGC |
| ২০২২ | ১,৭৫০ | ১৭০ | ৯.৭১% | UGC |
উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত আনুমানিক তথ্য।
সুপারিশ
- বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য ট্যাক্স ইনসেনটিভ এবং ম্যাচিং গ্রান্ট প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে, অর্থ মন্ত্রণালয়কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সাথে সমন্বয় করে R&D খাতে বিনিয়োগের উপর কর ছাড়, শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা এবং গবেষণা ব্যয়কে দ্বিগুণ বা তিনগুণ হারে করযোগ্য আয় থেকে বাদ দেওয়ার মতো নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
- শিল্প-শিক্ষাঙ্গন সংযোগ জোরদার করতে ইউজিসি, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন শিল্প সমিতির মধ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এই টাস্কফোর্সকে নিয়মিতভাবে শিল্প চাহিদা অনুযায়ী গবেষণা প্রকল্প চিহ্নিত করা, যৌথ গবেষণা ল্যাবরেটরি স্থাপনে উৎসাহিত করা এবং গবেষণা ফলাফল বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা প্রদানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও তহবিল (যেমন: উদ্ভাবন তহবিল) তৈরি করতে হবে।
- R&D খাতের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) এবং স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি)-এর অধীনে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও ফেলোশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। এই প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে R&D কাজে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম এবং উচ্চতর গবেষণার জন্য বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।