ডিজিটাল কপিরাইট সুরক্ষা: ইউটিউব ও ফেসবুকের যুগে প্রকাশকের চ্যালেঞ্জ

ব্যারিস্টার নাদিয়া  avatar   
ব্যারিস্টার নাদিয়া
ডিজিটাল কপিরাইট সুরক্ষা: ইউটিউব ও ফেসবুকের যুগে প্রকাশকের চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল কপিরাইট সুরক্ষা: ইউটিউব ও ফেসবুকের যুগে প্রকাশকের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ডিজিটাল মাধ্যমে কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রায় ৮৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ডিজিটাল মাধ্যমে কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রায় ৮৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬০০টি অভিযোগ ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্ম সংশ্লিষ্ট। এই পরিসংখ্যান ডিজিটাল যুগে প্রকাশকদের জন্য মেধা স্বত্ব সুরক্ষার ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে, বই, সাময়িকী ও অন্যান্য সৃজনশীল বিষয়বস্তুর অনলাইন প্রতিলিপি, অবৈধ আপলোড এবং বাণিজ্যিক ব্যবহার প্রকাশকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সৃজনশীলতার পরিবেশকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। অবৈধভাবে আপলোড করা পিডিএফ ফাইল, অডিওবুক এবং ভিডিও কন্টেন্টের কারণে মূল প্রকাশকদের আয় কমে যাচ্ছে, যা নতুন বিনিয়োগ এবং মানসম্মত কন্টেন্ট উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও একটি গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে World Intellectual Property Organization (WIPO) ক্রমাগত সদস্য দেশগুলোকে ডিজিটাল কপিরাইট ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে জোর দিচ্ছে।

প্রকাশকদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইনি কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সমাধান উভয়ই অপরিহার্য। বাংলাদেশ সরকার ২০০২ সালের কপিরাইট আইনকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালে নতুন কপিরাইট আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালে 'কপিরাইট আইন, ২০২৩' পাস করে, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মেধা স্বত্ব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। এই আইনের অধীনে, ডিজিটাল কন্টেন্টের অবৈধ ব্যবহার, বিতরণ বা বাণিজ্যিকীকরণের জন্য ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী আইনের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। তবে, আইনের বাস্তবায়ন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সমন্বয় সাধনে এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে। বিশেষত, ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে কপিরাইট লঙ্ঘনের নোটিশ পাঠানো এবং তা কার্যকর করানো একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া, যা ছোট ও মাঝারি প্রকাশকদের জন্য প্রায়শই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব কপিরাইট নীতি এই প্রক্রিয়াকে আরও ধীর করে তোলে।

ডিজিটাল কপিরাইট সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাদের প্রভাবও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। World Bank এবং Asian Development Bank (ADB) তাদের বিভিন্ন প্রকল্পে ডিজিটাল অর্থনীতি এবং মেধা স্বত্ব সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। World Bank এর 'Digital Economy Development Project' এর আওতায় অনেক উন্নয়নশীল দেশে ডিজিটাল কপিরাইট ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা হচ্ছে। একইভাবে, ADB তার 'Knowledge and Innovation Support Program' এর মাধ্যমে মেধা স্বত্ব সুরক্ষায় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নীতিগত সংস্কারে অংশীদারিত্ব করছে। বাংলাদেশের কপিরাইট অফিস এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে কাজ করে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন এবং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতে সচেষ্ট হলেও, ডিজিটাল কন্টেন্টের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা এবং প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তির উত্থান একটি নিরন্তর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা কন্টেন্ট তৈরি এবং তার মেধা স্বত্ব নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম হচ্ছে, যা বর্তমান আইনগুলোতে এখনো সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলস্বরূপ, বিদ্যমান আইনি কাঠামোকে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে।

বছর ডিজিটাল কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ (মোট) ইউটিউব/ফেসবুক সংশ্লিষ্ট অভিযোগ (%) নিষ্পত্তি হওয়া অভিযোগ (%)
২০২০-২১ ৫২০ ৬৫% ৪৫%
২০২১-২২ ৭০০ ৭২% ৫২%
২০২২-২৩ ৮৫০ ৭৫% ৫৮%
২০২৩-২৪ (প্রথমার্ধ) ৫০০ ৮০% ৬৫%

উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, বার্ষিক প্রতিবেদন ও অভ্যন্তরীণ ডেটা।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০২৩-এর অধীনে 'কপিরাইট ট্রাইব্যুনাল' দ্রুত কার্যকর করা এবং এর আওতায় বিশেষায়িত ডিজিটাল ফরেনসিক ইউনিট স্থাপন করা, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য কারিগরিভাবে দক্ষ হবে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে এই ট্রাইব্যুনাল দ্রুত কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো সরবরাহ করতে হবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'ন্যাশনাল ডিজিটাল কন্টেন্ট রেজিস্ট্রেশন ও মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম' তৈরি করা, যেখানে প্রকাশকরা তাদের ডিজিটাল কন্টেন্ট সহজে নিবন্ধন করতে পারবেন এবং লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত অটোমেটেড নোটিফিকেশন সিস্টেমের মাধ্যমে ইউটিউব, ফেসবুকসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানাতে পারবেন। World Bank এবং ADB এর কারিগরি সহায়তায় এই প্ল্যাটফর্মটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি করা যেতে পারে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে 'ডিজিটাল মেধা স্বত্ব সচেতনতা' পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল কন্টেন্টের নৈতিক ব্যবহার এবং কপিরাইট আইনের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত হয়। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহারকারীদের জন্য একটি জাতীয় নির্দেশিকা জারি করতে পারে, যেখানে কপিরাইট লঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার নাদিয়া

ব্যারিস্টার নাদিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator