খাদ্য মূল্যস্ফীতি: মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ও সরকারি ভর্তুকির কার্যকারিতা

ফারহানা ইয়াসমিন  avatar   
ফারহানা ইয়াসমিন
খাদ্য মূল্যস্ফীতি: মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ও সরকারি ভর্তুকির কার্যকারিতা
খাদ্য মূল্যস্ফীতি: মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ও সরকারি ভর্তুকির কার্যকারিতা
ছবি: সংগৃহীত

কলামিস্ট: ফারহানা ইয়াসমিন | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন)

📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: ফারহানা ইয়াসমিন | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন)

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মে ২০২৪-এ দেশের সার্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৯৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত এপ্রিলের তুলনায় সামান্য কম হলেও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এই প্রেক্ষাপটে, সরকারের খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচির কার্যকারিতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আলোচনা চলছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বর্তমান ভর্তুকি কাঠামো মধ্যবিত্তের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এর ফলে সমাজের একটি বৃহৎ অংশ কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে।

খাদ্যমূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি কেবল আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির ফল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, বাজার সিন্ডিকেট এবং কার্যকর তদারকির অভাবও এর জন্য দায়ী। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিলেও, এর সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, রমজান মাসকে কেন্দ্র করে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও, বাংলাদেশ ব্যাংক (BB) এর তথ্য অনুযায়ী, ঐ সময়ে বেশ কয়েকটি প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম ১৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিশেষ করে, আমদানি নির্ভর পণ্য যেমন ভোজ্যতেল ও ডাল মসুরীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম স্থিতিশীল থাকলেও, স্থানীয় বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যায়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) শুল্ক ও কর কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন আনলেও, তা ভোক্তামূল্যের ওপর তেমন ইতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। অন্যদিকে, কৃষি মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতাও অনেক সময় সরবরাহ ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি, যেমন খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি (OMS) এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে চাল ও আটা বিতরণ, মূলত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য প্রণীত। মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যারা এই কর্মসূচির আওতায় আসে না, তাদের জন্য মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কার্যকর কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যদিও সরাসরি খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে জড়িত নয়, তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কোম্পানিগুলোর মুনাফার ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির সাথে সাথে পণ্যের দামও আনুপাতিক হারে বেড়েছে, যা ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করলেও, অভ্যন্তরীণ বাজারের সরবরাহ ও মূল্যের ভারসাম্য রক্ষায় এর সরাসরি ভূমিকা সীমিত। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ভর্তুকি কর্মসূচির আওতা ও পরিধি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে মধ্যবিত্তের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও এর সুবিধা ভোগ করতে পারে। বিশেষ করে, নির্দিষ্ট আয়ের সীমা নির্ধারণ করে তাদের জন্য বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

পণ্য মে ২০২৪-এ মূল্যবৃদ্ধি (মাসিক) মে ২০২৪-এ মূল্যবৃদ্ধি (বার্ষিক) মূল্যস্ফীতিতে অবদান (মে ২০২৪)
চাল (মোটা) ১.২% ৯.৮% ১.৫%
আটা/ময়দা ০.৮% ৯.৫% ০.৮%
ডাল (মসুর) ২.৫% ১২.৩% ১.২%
ভোজ্যতেল ০.৫% ৬.১% ০.৬%
পেঁয়াজ ৩.১% ১৮.৭% ১.৪%
চিনি ১.৯% ১৪.২% ০.৯%
সবজি (গড়) ২.৮% ১০.৫% ২.০%

উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর বিশ্লেষণ

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বাজার তদারকি আইন, ২০২২-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে নিত্যপণ্যের পাইকারি ও খুচরা মূল্যের অস্বাভাবিক তারতম্য রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং বাজার সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে আমদানি শুল্ক ও কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার করার একটি সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা সরাসরি ভোক্তামূল্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং এর কার্যকারিতা নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
  • অর্থ মন্ত্রণালয়কে একটি সুনির্দিষ্ট 'মধ্যবিত্ত খাদ্য সুরক্ষা কর্মসূচি' চালু করতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট আয়সীমার মধ্যে থাকা পরিবারগুলোকে 'ফুড কার্ড'-এর মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে নির্ধারিত কয়েকটি নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হবে, যা খাদ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহানা ইয়াসমিন

ফারহানা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator