অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে জৈব কৃষির আওতায় আনা জমির পরিমাণ গত পাঁচ বছরে প্রায় ২৭% বৃদ্ধি পে...

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে জৈব কৃষির আওতায় আনা জমির পরিমাণ গত পাঁচ বছরে প্রায় ২৭% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। যদিও এই বৃদ্ধি উৎসাহব্যঞ্জক, মাঠ পর্যায়ে কৃষক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত জৈব সারের সহজলভ্যতা এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার সমন্বয় সাধন এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে টেকসই কৃষি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে জৈব কৃষির প্রসারে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর ভূমিকা আরও সক্রিয় ও দৃশ্যমান হওয়া জরুরি, যাতে কৃষকরা কেবল রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জৈব পদ্ধতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন।

জৈব কৃষির মূল ভিত্তি হলো মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদিত খাদ্যের পুষ্টিমানকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) পরিচালিত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সুনির্দিষ্ট জৈব সার ও শস্য আবর্তন পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে কিছু কিছু ফসলে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের পরিমাণ প্রথাগত পদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত টমেটোতে লাইকোপেন এবং ব্রোকলিতে ভিটামিন সি-এর মাত্রা ১৫-২০% বেশি পাওয়া গেছে। তবে, এই পুষ্টিগত পার্থক্য ভোক্তাদের কাছে স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য আরও নিবিড় গবেষণা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন। পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর অধীনে পরিচালিত 'ন্যাশনাল বায়োডাইভারসিটি স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান' (NBSAP) এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জৈব কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে, কারণ এটি কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ভূমি ও জল দূষণ হ্রাস করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরাসরি অবদান রাখে।

মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের জন্য জৈব কৃষি পদ্ধতি গ্রহণ ও এর অর্থনৈতিক লাভজনকতা নিশ্চিত করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। অনেক কৃষক প্রাথমিকভাবে উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কায় এই পদ্ধতিতে যেতে দ্বিধা করেন। তবে, দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের জন্য বাজারে উন্নত মূল্য প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে। DAE এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা সহনশীল জৈব ধানের জাত উদ্ভাবনে BRRI এর গবেষণা আশার আলো দেখাচ্ছে। এই জাতগুলো একদিকে যেমন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম, তেমনি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক। পাশাপাশি, BARI বিভিন্ন প্রকার জৈব বালাইনাশক এবং জৈব সারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রচারে কাজ করছে, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহজলভ্য করা গেলে জৈব কৃষির বিস্তার দ্রুততর হবে। এই উদ্ভাবনগুলো কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে তারা প্রথাগত পদ্ধতির উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে টেকসই কৃষি ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারেন।

জৈব ফসলের ধরন ২০১৮-১৯ অর্থবছর (জমির পরিমাণ, হেক্টর) ২০২৩-২৪ অর্থবছর (জমির পরিমাণ, হেক্টর) শতকরা বৃদ্ধি (%)
জৈব ধান ৫,৪০০ ৭,২০০ ৩৩.৩৩
জৈব সবজি ৩,১০০ ৪,১০০ ৩২.২৫
জৈব ফল ১,২০০ ১,৫০০ ২৫.০০
অন্যান্য জৈব ফসল ১,০০০ ১,১০০ ১০.০০
সর্বমোট ১০,৭০০ ১৩,৯০০ ২৯.৯১

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর সমন্বিত প্রতিবেদন, ২০২৪

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে 'জৈব কৃষি উন্নয়ন নীতি, ২০২৫' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে জৈব পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া এবং বাজারজাতকরণের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনগত কাঠামো থাকবে।
  • DAE, BARI এবং BRRI-কে যৌথভাবে দেশের প্রতিটি কৃষি অঞ্চলে অন্তত একটি করে 'জৈব কৃষি মডেল ফার্ম' স্থাপন করতে হবে, যেখানে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং BARC-এর গবেষণালব্ধ নতুন জাত ও প্রযুক্তি সরাসরি মাঠে প্রয়োগ করে দেখানো হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে 'সবুজ অর্থায়ন নীতিমালা' এর আওতায় জৈব কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদান করতে হবে, যার মাধ্যমে তারা জৈব সার উৎপাদন ইউনিট স্থাপন এবং জৈব কৃষি সরঞ্জাম ক্রয়ে উৎসাহিত হবেন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator