About Us
M. R. Sumon
প্রকাশ ২৪/০৪/২০২১ ১২:০৯এ এম

গফরগাঁওয়ের আঞ্চলিক ভাষা

গফরগাঁওয়ের আঞ্চলিক ভাষা Ad Banner

গফরগাঁও অঞ্চলটি ময়মনসিংহ সদরের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। এর দক্ষিণ থেকেই ঢাকা জেলার শুরু। উত্তরে ময়মনসিংহ জেলার আলাপসিং পরগণা, পূর্বে নান্দাইল থানা ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চল, পশ্চিমে ত্রিশাল, ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা থাকা। সাবেক ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত হোসেনশাহী পরগণার কিয়দংশ ও তপেরন-ভাওয়াল পরগণার অধিকাংশ ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় এবং ঢাকা জেলায় অবস্থিত।

ইংরেজ শাসনের আগে এদেশে পরগণাকে কেন্দ্র করে শাসনকার্য পরিচালিত ছিল বলে গফরগাঁও অঞ্চলের সাথে ভালুকা ও ঢাকা জেলার লোকজনের কথাবার্তায় এবং চাল-চলনে অনেক সাদৃশ্য দেখা যায়। তবে পার্থক্যও লক্ষণীয় এবং রয়েছে নিজেদের স্বকীয়তা। কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের সাথে গফরগাঁওয়ের মানুষের ভাষা অতি সহজেই পার্থক্য করা যায়।

মুখের কথা শুনা মাত্রই বলে দেওয়া যায় কে কোন অঞ্চলের। লোকজনের কথাবার্তার প্রকাশভঙ্গীমা এবং বিভিন্ন শব্দের উচ্চারণ ধ্বনিতেই এই পার্থক্য সুস্পষ্ট। এছাড়া এক এলাকার কোন কোন কথা অন্য এলাকার লোকেরা সহজে বুঝতে পারে না। আলাপসিং পরগণার লোকেরা যেখানে বলে, "দেক্কে, অত হাট ফারেন হ্যা" তার স্থলে কিশোরগঞ্জের লোকেরা বলে থাকে,"দেখ হোয়াইন্ন; অত চিল্লাইন কেরে, গফরগাঁয়ের লোকেরা বলে থাকে,"এচ্চু, অত চিক্কাইর ফারুইন হেয়া, এবং পাশ্ববর্তী ঢাকা জেলার লোকেরা বলে থাকে, "এচ্চু, অত কুমাইন ক্যা"। 'হাট ফারা' বা 'কুমাইন' কথাটি গফরগাঁওয়ের লোকেরা বুঝে না। গফরগাঁওয়ের পার্শ্ববর্তী ঢাকা জেলার লোকজনের কথাবার্তায় ও চাল-চলনে পার্থক্য খুব বেশি না হলেও এ অঞ্চলের এমন কিছুকিছু কথাবার্তা সাধারণ লোকজন বলে থাকে যা অন্য অঞ্চলের লোকের পক্ষে বুঝে উঠা বড় সহজ হয় না।

এই তিন এলাকাতেই এক এলাকার অনেক কথাবার্তা অন্য এলাকার লোকেরা বুঝে না। যেমন- আলাপসিং পরগণার অধিবাসীরা যখন বলে- "চাটি মারলেন বুঝি, এইহান মেয়া ভাই এর ইষ্টি" তখন সেসব কথা গফরগাঁও বা কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের লোকের পক্ষে বুঝে উঠা সম্ভব নয়। তেমনি যখন কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের লোকেরা বলেন, "আমি বড় পরখ কইর‍্যা আনছি, তানির খিরতাইনী বা আপনি কি তা কইন কুইল্লে" ইত্যাদি তখন সে সব কথা আলাপসিং বা গফরগাঁওয়ের লোকজনের পক্ষে বুঝে উঠা সম্ভব হয় না। আবার তেমনি গফরগাঁও অঞ্চলের, "তিনি বোলে কেরে, এর মাধ্যে একটা ব্যাঙ্কো আছে, অঁয়, হঁয়, বড় পাঁইতের একটা তাগি লাগাইয়া আবার একটা ছোড়াণী ঝুলাইছ" ইত্যাদি অন্য দু'অঞ্চলের লোকেরা বুঝে না।

কাজেই দেখা যায় প্রত্যেক অঞ্চলেই কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে এবং গফরগাঁও আঞ্চলিক ভাষার শব্দে;  শব্দের ধ্বনি ও বাচনভঙ্গি তার পার্শ্ববর্তী এলাকার ভাষা থেকে কিছুটা স্বতন্ত্র এবং এই স্বতন্ত্র রূপটি বাইরের যে কোন অঞ্চলের লোকের কাছে সহজেই ধরা পড়ে। তাছাড়া এ অঞ্চলের ভাষায় এমন অনেক শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যা এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল গুলোতে সাধারণত ব্যবহার হয় না। এই সব শব্দের অনেক গুলি বাংলা শব্দ নয় বলে অনেকে মনে করে থাকেন। কিছু শব্দ নিচে অর্থসহ দেওয়া হলঃ

১। অঁয় হঁয়- ও-হো তারিফ প্রকাশের ছলে ২। আরগাযা- বোকা ৩। আরে বাইশানরে- আরে বাপরে ৪। এচ্চু/আচ্চু- এই যে শুনেন ৫। এর মাধ্যে ব্যাঙ্কো আছে- এর মধ্যে রহস্য আছে ৬। এংচাইর‍্যা- খিট খিট মেজাজের ৭। উদাইর‍্যা- অকর্মণ্য ৮। কাইনযা-পঁচা ৯। কুঁইয়া-পঁচা ১০। কুননাইয়্যা- কনুই মেরে ১১। কেইচ্চা- নির্দয়ভাবে প্রহার করা ১২। খিরতাইনী- শ্বাশুড়ী ১৩। ছুছ- কুটিল স্বভাবের ১৪। ছ্যাদাভ্যাদা- অগোছালো ১৫। ছোড়ানী- তালার চাবি ১৬। চেউকদানি- ক্ষেপানো ১৭। টুইন্যা/পুইল্লা/বিছকিনা- ছোট ১৮। দুন্দা- হাবা ১৯। থেনহাইয়্যা- আছাড় মারিয়া ২০। পালহারা- গলা ধাক্কা ২১। পাঁইতের- জুৎসুই ২২। ফইহর- ফাঁকিবাজি ২৩। ফিশূইন্ন্যা- হিংসুটে ২৪। বডায়াফেলা- বোটাসহ ছিঁড়ে ফেলা ২৫। বাইল- ভাঁওতাবাজি ২৬। বাইত করা- বমি করা ২৭। বাইতে- বাড়িতে ২৮। বানহানি- তারিফ করা ২৯। দরকচা- আধা নরম ৩০। হেয়াই -সেলাই করা ৩১। হইল করা- ঠিক করা ৩২। হোয়াই- সেমাই ৩৩। হেবলা- সে সময় ৩৪। সিনাজুরী- নির্লজ্জ ৩৫। শকশ- শয়তান ৩৬। শাঙ্কু- খুব বড় ৩৭। বিষ্টুরী- খুব অল্প ৩৮। শিক কনে ভরা- কানায় কানায় ভরা ৩৯। বরহী- ছাগল ৪০। জামহি- খাঁচা

এ জাতীয় আরো বহু শব্দ আছে এবং এসবের ব্যবহার গফরগাঁওয়ের আঞ্চলিক ভাষায় বহুল পরিমানে পরিলক্ষিত হয়। এসব শব্দের কোন কোনটা হয়তো অন্যান্য জেলায় আঞ্চলিক ভাষাতেও ব্যবহৃত হয়। তবে গফরগাঁওয়ের আশেপাশের এলাকাতে এসবের ব্যবহার বড় বেশি দৃষ্ট হয় না।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ