Soumen Biswas - (Chattogram)
প্রকাশ ২৩/০২/২০২১ ১১:৫৫এ এম

যদি ফ্রিল্যান্সার হতে চান

যদি ফ্রিল্যান্সার হতে চান Ad Banner

ভেতো বাঙ্গালির দেশে অন্তর্জাল বা ইন্টারনেট শুরুর দিকে ছিল বড়লোকেদের বিলাসিতার দ্রব্য। এরপর কেটে গেছে অনেকটা সময়। ইন্টারনেট এখন বনেদি ব্যবসায়ী থেকে পাড়ার মুদির দোকানদার পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। তবে বাঙ্গালির ইন্টারনেট সম্পর্কে ধারণা কিন্তু পাল্টায়নি।

অন্তর্জালের ব্যাপারটা এখনো অধিকাংশের কাছে নিখাদ বিনোদনের মাধ্যম, আর কিছুই নয়। যে ছেলেটা ফেসবুকের মাধ্যমেই আয় করে, হাতখরচটা ফেসবুকই এনে দেয়- তাকে তার মা হয়তো এখনো বলেন,  “কি করিস সারাদিন ফেসবুকে? সুন্দরী মেয়েদের ছবি দেখিস খালি? আজ খবর আছে তোর। উনি খালি আসুক আগে অফিস থেকে!”  থাক সে সব কথা।

ফ্রিল্যান্ নামটা শুনে হয়তো অনেকেই চোখ কপালে তুলে ভাবছেন, এসব তো প্রোগ্রামার, কম্পিউটার এক্সপার্টের কাজ। এসব জেনে আমাদের কি লাভ? শুনে অবাক হবেন, ফ্রিল্যান্সিং ব্যাপারটার সাথে সেসবের তেমন সম্পর্কই নেই! হ্যাঁ, অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং ব্যাপারটায় এক্সপার্ট হতে হলে কম্পিউটার না্মক যন্ত্রটির সাথে ভালোই খাতির থাকা লাগে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সিএসই থেকে ডিগ্রি থাকা লাগবে ফ্রিল্যান্সিং এর জন্যে। ঘরে বসেই অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং শেখা সম্ভব। ব্যাপারটা খোলাসা করে বলা যাক। 

ফ্রিল্যান্সিং কী:  ফ্রিল্যান্সিং প্রথম শুরু হয়েছিলো ১৯৯৮ সালের দিকে। অনলাইনে একটা মার্কেটপ্লেস খোলা হয়েছিলো, সেখান থেকেই বলতে গেলে ফ্রিল্যান্সিংয়ের শুরু। ব্যাপারটা বেশ মজাদার। ধরাবাধা অফিস টাইম নেই, যখন ইচ্ছে কাজ করলেই হলো! এই কাজ হতে পারে বিভিন্ন রকম। ওয়েব ডিজাইনিং থেকে শুরু করে গ্রাফিক ডিজাইনিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, বিষয়ভিত্তিক আর্টিকেল লেখা বা ডাটা এন্ট্রি হতে পারে ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়।  এখানে দুই পক্ষ থাকেন। ক্লায়েন্ট আর ফ্রিল্যান্সার। ক্লায়েন্ট ফ্রিল্যান্সারকে বিভিন্ন কাজ দিয়ে থাকেন, আর একটা নির্দিষ্ট সময়ের (যেটি ফ্রিল্যান্সারের ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করা হয়) মধ্যে কাজ শেষ করে ক্লায়েন্টকে পাঠিয়ে দিতে হয়। ক্লায়েন্টের সাথে কাজ শুরুর আগেই চুক্তি করা হয় পারিশ্রমিক নিয়ে। কাজ হয়ে গেলে, ক্লায়েন্ট ফ্রিল্যান্সারকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়। ব্যস, হয়ে গেল একটি সফল ফ্রিল্যান্সিং! 

ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে হলে:  প্রথমে আপনি যে বিষয়টি নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করতে চান, সে বিষয়ে ছোটখাটো একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে যেতে হবে আপনাকে। আপনি যদি কয়েকটি বিষয়ে দক্ষ হন, তাহলে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে বেশি কাজ পাবেন। এখানে বেশিরভাগ ক্লায়েন্টই অবাঙ্গালী হয়ে থাকেন। তাই তাদের সাথে যোগাযোগের জন্যে ইংরেজি ভাষাটা বেশ ভালোভাবে রপ্ত করতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যতো অভিজ্ঞতা, কাজ পাবার সম্ভাবনা ততো বেশি। 

মার্কেটপ্লেস:  এতক্ষণে অনেকের মনেই হয়তো প্রশ্ন জাগছে, ‘”সবই বুঝলাম, কিন্তু এই ক্লায়েন্ট-ফ্রিল্যান্সার লেনদেনের ব্যাপারটা হবে কোথায়?” এই ‘ব্যাপারটা’ হবে মার্কেটপ্লেসে। না, এটি কিন্তু কাঁচাবাজার কিংবা পাইকারি বাজার নয়। এটি সম্পুর্নই অনলাইন নির্ভর একটি মার্কেট যার মাধ্যমে ক্লায়েন্টরা খুঁজে পান ফ্রিল্যান্সারদের। মার্কেটপ্লেসে পুরো ব্যাপারটা ঘটে সুসংগঠিত একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।  প্রথমে ক্লায়েন্ট বা ক্লায়েন্টরা মার্কেটপ্লেসে আসেন। সেখানে তারা ফ্রিল্যান্সারদের করা বিভিন্ন বিড পর্যালোচনা করে দেখেন। একজন ফ্রিল্যান্সার তার করা বিডে বলে দেয় যে সে কাজটি কত সময়ের মধ্যে করে দিতে পারবে আর কতো পারিশ্রমিক লাগবে। ক্লায়েন্ট তারপর সব বিড থেকে যেটিকে সবচেয়ে যোগ্য মনে করবেন, সেটিই গ্রহণ করবেন। তারপর ফ্রিল্যান্সারদের সাথে যোগাযোগ করে ক্লায়েন্ট কাজের ব্যাপারে সবকিছু সম্পন্ন করেন। কাজ শেষ হয়ে গেলে অর্থ বিভিন্ন উপায়ে  পরিশোধ করে দেয়া হয়।  ভালো

ফ্রিল্যান্সার হতে গেলে কী প্রয়োজন:  শুধু ফ্রিল্যান্সার হলেই কিন্তু চলবে না। আপনি ফ্রিল্যান্সার হলেন, কিন্তু কোন ক্লায়েন্ট আপনাকে কাজ দিচ্ছে না- এমনটা হলে ফ্রিল্যান্সিং আপনার জন্যে না। ভালো ফ্রিল্যান্সার হতে হলে আপনাকে বেশকিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। যেমন, মার্কেটপ্লেসে আপনি যখন বিড করবেন, তখন ক্লায়েন্ট আকৃষ্ট হবে আপনার প্রোফাইল দেখে। সেজন্যে প্রোফাইল হতে হবে চমৎকার, যাতে ক্লায়েন্ট দেখেই আগ্রহ প্রকাশ করে কাজ দিতে। বিভিন্ন মার্কেটপ্লেস ঘুরে, সেখানে ক্লায়েন্টদের চাহিদা বুঝে প্রোফাইল তৈরি করা উচিৎ।দারুণ একটা প্রোফাইল বানাতে হলে কয়েকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। যেমনঃ  ১। যেকোন একটা বিষয়ে এক্সপার্ট হতে হবে। বাংলাদেশে আউটসোর্সিং কোচিং সেন্টার আছে, সেখান থেকে এ বিষয়ে শেখা যায়। তাছাড়া নিজে নিজে হাতে কলমে চেষ্টা করাটা খুবই দরকারি। ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখেও অভিজ্ঞ হবার পথে এগিয়ে যাওয়া যায়।  ২। আপনি যে বিষয়ে এক্সপার্ট হয়েছেন, সে বিষয়টি নিয়ে দুই একটা কাজ করে রাখতে হবে। যেমন, আপনি যদি লেখালেখিতে ভালো হন, তাহলে আপনার লেখা কোন একটা আর্টিকেল প্রোফাইলে যোগ করে দিতে হবে।  ৩। oDesk.com, Freelancer.com এর মতো জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেসে ফ্রিল্যান্সিং স্কিল মেজারমেন্ট নামে একটা পরীক্ষা দেয়া যায়। এগুলোতে অংশগ্রহণ করলে সেটি প্রোফাইলের জন্যে মন্দ হবে না কিন্ত!  ৪। ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ছাড়াও আপনার প্রোফাইল আর নৈপুন্য বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ব্লগ আর ফোরামে শেয়ার করতে পারেন। এতে প্রোফাইলের পরিচিতি বাড়বে, ফ্রিল্যান্সিংয়ে যা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।  ক্লায়েন্ট পাওয়ার সহজ উপায়:  ক্লায়েন্ট পাবার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো কারো রেফারেন্সে কাজ পাওয়া।  চমৎকার একটা প্রোফাইল প্রস্তুত করে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে থাকতে হবে প্রথম কাজ পাবার জন্যে। এখানেই ধৈর্যের আসল পরীক্ষা শুরু। অনেক অপেক্ষার পর একটা কাজ হাতে পেলে সেটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিখুতভাবে শেষ করতে হবে। এতে ক্লায়েন্ট খুশি হয়ে হয়তো পরের কাজটিও আপনাকে দিয়ে দেবে, কিংবা অন্যের কাছে রেফারেন্স করবে আপনার নাম। এভাবেই ফ্রিল্যান্স জগতে আপনি হতে পারবেন পরিচিত মুখ। 

ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিষয়:  ক্লায়েন্ট-ফ্রিল্যান্স-মার্কেটপ্লেস এসব খটমটে শব্দের ভীড়ে একটু কি খেই হারাচ্ছেন? মনে কি হচ্ছে, “সবই বুঝলাম। কিন্তু কি নিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করবো?”  সবকিছুরই উত্তর পাবেন এখানে। ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে নানা রকম কাজ করা সম্ভব। এই কাজগুলোকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা যায়।  তুলনামূলক সহজ কাজগুলোর মধ্যে আছে ডাটা এন্ট্রি বা আর্টিকেল লেখার মতো কাজ। বলাই বাহুল্য, এমন কাজের জন্যে প্রচুর বিড আসে, তাই এমন কাজ পেতে হলে একজন ফ্রিল্যান্সারকে বেশ বড় রকমের একটা প্রতিযোগিতায় পড়তে হয়।তুলনামূলক কঠিন কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইনিং- এমন সব কাজ। সঙ্গত কারণেই এমন কাজে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া যায়, প্রতিযোগিতাও কিছুটা কম। কিন্তু এসব কাজ নিখুঁতভাবে করতে হলে এক্সপার্ট হতে হবে। নইলে ক্লায়েন্টের হাসিমুখ দেখার সৌভাগ্য আপনার হবে না।  বিষয় যা-ই হোক না কেন, একটা ব্যাপার সবসময় মাথায় রাখতে হবে। কাজটা কত কঠিন আর সেটি করতে কি সময় আপনি পাচ্ছেন- এর মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। পারিশ্রমিকের ব্যাপারটা আপনার অভিজ্ঞতার ওপর অনেকটা নির্ভর করবে। 

কিভাবে পারিশ্রমিক পাবেন:  ইন্টারনেট কিন্তু খুব নিরাপদ কোন জায়গা নয়। তাই ফ্রিল্যান্সিং করে যদি পারিশ্রমিক পাওয়ার প্রক্রিয়াটা না জানা থাকে, তাহলে খুব সহজেই আপনি বোকা বনে যেতে পারেন। আপনার পরিশ্রম হয়ে যেতে পারে স্রেফ বেগার খাটা। সেজন্যে পারিশ্রমিক পাবার উপায়গুলো পরিষ্কার করে দেয়া দরকার। 

প্রাপ্য অর্থ বুঝে নেবার জন্যে ব্যাংক অবশ্যই একটি নিরাপদ মাধ্যম। কিছু মার্কেটপ্লেস থেকে সরাসরি ব্যাংক একাউন্টে ব্যালান্স ট্রান্সফার করা যায়। কিন্তু যেসব মার্কেটপ্লেসে এ ব্যবস্থা নেই, সেখানে অনলাইন পেমেন্ট ট্রান্সএকশান প্রসেসে পারিশ্রমিক বুঝে নেয়া যায়। কিন্তু এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া আর সব কাজ শেষ করতে মাস দেড়েক লেগে যায়।নিয়মিত ক্লায়েন্টরা সাধারণত এসব ঝামেলায় যান না। তারা ফ্রিল্যান্সারদের কাজ দেন ই-মেইল বা অন্য উপায়ে, আর পারিশ্রমিকও সরাসরি ফ্রিল্যান্সারদের ব্যাংক একাউন্টে পাঠিয়ে দেন। 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ