শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১
  • সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম:
Belal Uddin
প্রকাশ ২১/০২/২০২১ ০৪:৪৫পি এম

ভাষার বিশুদ্ধতা শরীয়তের কাম্য

ভাষার বিশুদ্ধতা শরীয়তের কাম্য Ad Banner

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। একটি রাজনৈতিক ঘটনার কারণে বাংলা ভাষার বিষয়টি ফেব্রুয়ারি মাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। এখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা-দিবস হিসেবে। তাই ফেব্রুয়ারি মাসে দেশব্যাপী ভাষাকেন্দ্রিক তৎপরতা নতুন মাত্রা লাভ করে।

সময়ের গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে না গিয়ে আমাদের কর্তব্য সকল পরিস্থিতিতে যথার্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখা। এজন্য শরীয়তের দৃষ্টিতে মাতৃভাষার গুরুত্ব এবং এ বিষয়ে সাধারণ মুসলমান ও আলিম-তালিবে ইলমদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ার ‘আমীনুত তা’লীম’ ও মাসিক আলকাউসারের তত্ত্বাবধায়ক মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেবের একটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়।

মূল বিষয় ছাড়াও প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন আলোচনা তাতে উঠে এসেছে। আশা করি, পাঠকবৃন্দ এর দ্বারা উপকৃত হবেন। আলকাউসারের পক্ষ হতে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আবদুল্লাহ।

প্রশ্ন : আমাদের দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ দিবস। এখন তা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেছে। আমরা যেহেতু মুসলমান তাই সকল বিষয়কে কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়ার আলোকে মূল্যায়ণ করা আমাদের কর্তব্য। তাই শরীয়তের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব এবং মাতৃভাষার প্রতি আমাদের দায় ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাই। 

উত্তর : মাতৃভাষার গুরুত্বের যে দিকগুলো আছে তা কিন্তু ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক নয়। এটি একটি সাধারণ বিষয় এবং সব সময়ের বিষয়। আপনার মূল প্রশ্ন যদিও মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে, তবে তাতে একুশে ফেব্রুয়ারিকে একটি বিশেষ দিবস হিসেবে উদযাপনের প্রসঙ্গও এসেছে। এই বিষয়েও আমাদের সচেতনতা প্রয়োজন। দিবসের ক্ষেত্রেও শরীয়তের কিছু নীতি-নির্দেশনা আছে, যা জানা থাকা জরুরি। এটা ঠিক যে, পরিবেশ-পরিস্থিতি হিসেবে সকল মুনকারের প্রতিবাদ করা সবার জন্য ফরয নয়। তবে তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। প্রচলিত বিষয়গুলো সম্পর্কে শরীয়তের বিধি বিধান জেনে নেওয়া সবার জন্য জরুরি। অন্তত ইলম ও আকীদার পর্যায়ে তো খুবই জরুরি। এজন্য শরীয়তে দিবস পালন সম্পর্কে কী কী নির্দেশনা আছে, নিয়মিত সকল কাজ বন্ধ করে, অফিস-আদালতে বিরতি দিয়েই দিবস পালন করতে হবে, না অন্য কোনো পদ্ধতিও হতে পারে, তা জানা দরকার। যাই হোক, আপনার মূল প্রশ্ন ছিল, মাতৃভাষার গুরুত্ব এবং আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে। এ প্রসঙ্গে প্রথম কথা হচ্ছে, যাদের দ্বীনী ভাষা ও মাতৃভাষা অভিন্ন তারা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। অর্থাৎ আরব মুসলমান। তাদের দ্বীনী ভাষা যেমন আরবী তেমনি মাতৃভাষাও আরবী। তাদের দায়িত্ব কম। পক্ষান্তরে যাদের দ্বীনী ভাষা ও মাতৃভাষা এক নয় অর্থাৎ অনারব মুসলমান, তাদের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভাষা দুটি : দ্বীনী ভাষা ও মাতৃভাষা। এরপর দাওয়াতের স্বার্থে কিংবা দুনিয়াবী প্রয়োজনে অন্য কোনো ভাষারও প্রয়োজন হতে পারে। আমার প্রশ্ন হল, মাতৃভাষার গুরুত্ব বলতে কোন দিকটি আপনি জানতে চাচ্ছেন? 

প্রশ্ন: আমি শরয়ী দৃষ্টিকোণ জানতে চাচ্ছি, অর্থাৎ শরীয়তের দৃষ্টিতে মাতৃভাষার গুরুত্ব কী এবং তা শরীয়তের কোন কোন দলীল দ্বারা প্রমাণিত-এ বিষয়ে বিস্তারিত বললে আমরা উপকৃত হব ইনশাআল্লাহ। 

উত্তর : এ সম্পর্কে যদি শরীয়তের দলীল-প্রমাণের শাস্ত্রীয় আলোচনা করতে হয় তাহলে তা কঠিন ও দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই আমি কিছু সহজ কথা বলি। দেখুন, ইসলাম যখন আরবের সীমানা পার হয়ে আজমে পৌঁছে গেল তখন সেসব অঞ্চলের ভাষার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম, মুজাহিদীনে ইসলাম ও দু‘আতে ইসলাম-এর অবস্থান কী ছিল, তা আমরা দেখতে পারি। তারা কি সেসব অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে তাদের মাতৃভাষা ত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন? করেননি। তাদেরকে দ্বীনী ভাষার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন, কিন্তু মাতৃভাষা ত্যাগ করতে বলেননি। এ থেকে বোঝা যায় যে, ইসলাম কাউকে মাতৃভাষা ত্যাগ করার আদেশ করে না। শরীয়তের কোথাও এই আদেশ নেই এবং কোনো মুসলিম মনীষীও তা বলেননি।

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, সকল ভাষাই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ও তাঁর নেয়ামত। কুরআন মজীদে আল্লাহ বলেছেন, এই আয়াতে ইনসান বলতে শুধু আরবের ইনসানকে বোঝানো হয়নি; বরং সমগ্র মানবজাতিকেই বোঝানো হয়েছে। সকল মানুষকে নিজ নিজ ভাষায় ভাবপ্রকাশের যোগ্যতা আল্লাহ তাআলাই দান করেছেন। তদ্রূপ সূরা ‘আলাকে আল্লাহ তাআলা বলেন, অর্থাৎ ‘আল্লাহ কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন।’ কী শিক্ষা দিয়েছেন, কাদের শিক্ষা দিয়েছেন এগুলো উল্লেখ করা হয়নি। কেননা, তা অত্যন্ত ব্যাপক। সকল জাতি, সকল ভাষা এবং কলম দ্বারা শেখার যা কিছু আছে সব এতে অন্তর্ভুক্ত। সারকথা হচ্ছে, মুখের ভাষা, লেখার ভাষা, ভাবপ্রকাশের যোগ্যতা এগুলো আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নেয়ামত। সে হিসেবেই একে মূল্যায়ন করতে হবে।

তৃতীয় কথা এই যে, সব মানুষই দুনিয়াবী প্রয়োজনে মাতৃভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু ইসলামের পর তাতে ভিন্ন একটি মাত্রা যুক্ত হয়। অর্থাৎ যে পূর্বে অমুসলিম ছিল সে ইসলাম গ্রহণের কারণে আর যে মুসলিম হয়েও ইতিপূর্বে দাওয়াতী দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন ছিল সে সচেতন হওয়ার পর অনুভব করে যে, দৈনন্দিন প্রয়োজন ছাড়াও মাতৃভাষাকে কাজে লাগানোর আরো ক্ষেত্র আছে। ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রচারে মাতৃভাষা ব্যবহার করা কর্তব্য।

কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন, অর্থাৎ আল্লাহ সকল রাসূলকে স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছেন। ইসলামের নির্দেশনা হল যাদেরকে দাওয়াত দেওয়া হবে তাদেরকে তাদের ভাষায় দাওয়াত দিতে হবে, যেন তারা বুঝতে পারে। অতএব ভাষাচর্চায় আত্মনিয়োগ করার এটিও একটি ক্ষেত্র এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এ উদ্দেশ্যে ভাষাচর্চায় যারা আত্মনিয়োগ করবে তাদের এই কাজ আমলে ছালেহ হিসেবে গণ্য হবে। অতএব শরীয়তের দৃষ্টিতে তা কাম্য। শর্ত হল নিয়ত ও কর্মপদ্ধতি সঠিক হতে হবে। আরেকটি কথা এই যে, মাতৃভাষা চর্চাকে যদি শুধু মোবাহ বা বৈধ কাজ হিসেবেও ধরে নেওয়া হয় তবুও শরীয়তের অন্য একটি মূলনীতির দ্বারা তা মাতলূব বা ‘করণীয়’ সাব্যস্ত হয়। শরীয়তের নির্দেশ হচ্ছে, মু’মিন যে কাজই করুক তা ইতকানের সাথে করবে, অর্থাৎ নিখুঁতভাবে করতে হবে।

হাদীসে এসেছে, ‘সবল মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম।’-সহীহ মুসলিম পৃ. ৬৭২৮ সকল কাজ নিখুঁতভাবে করার বিষয়ে বিভিন্ন হাদীসে সুস্পষ্ট নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। মুমিনকে যেমন আখিরাতের বিষয়ে বিচক্ষণ হতে হবে তেমনি দুনিয়ার কাজকর্মেও যত্ন ও মনোযোগিতা থাকতে হবে। আর যে বিষয়গুলো শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তা শিল্পমানসম্পন্ন হওয়াও শরীয়তের কাম্য। এজন্য মাতৃভাষাকে আপনি দ্বীনের কাজে ব্যবহার করুন কিংবা দুনিয়ার কাজে, তা বিশুদ্ধ হওয়া কাম্য।

এজন্য মৌলিকভাবে বিষয়টি মোবাহ ধরে নিলেও উপরোক্ত নীতির দ্বারা তা শরীয়তের দৃষ্টিতে মাতলূব করণীয় বলে সাব্যস্ত হয়। এরপর ভাষার বিশুদ্ধতার বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। একদম অক্ষর থেকে শুরু করতে হবে। অক্ষরগুলো সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে হবে, শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার বিশুদ্ধ ও ব্যকরণসম্মত হতে হবে। পঠনের ক্ষেত্রে আবৃত্তির নিয়ম-কানুন রক্ষা করতে হবে। লেখার ক্ষেত্রেও শব্দ, বাক্য, বিষয়বস্তু বিশুদ্ধ ও শিল্পসম্মত হওয়ার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। দেখুন, আরবী ভাষা আরবদের জন্য যেমন দ্বীনী ভাষা তেমনি তা তাদের মাতৃভাষাও বটে। সাহাবায়ে কেরাম এই ভাষায় শুধু যিকির-আযকার করতেন, কুরআন তেলাওয়াত করতেন এমন নয়, তাদের দৈনন্দিন কজকর্মও এই ভাষায় সম্পন্ন হত।

হাদীস শরীফে আমরা দেখি যে, তাঁদের দৈনন্দিন কাজকর্মেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষার বিশুদ্ধতা, উপযুক্ত শব্দচয়ন ইত্যাদির প্রতি তাকিদ করেছেন। একবার এক সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলেন। তিনি বাহির থেকে সালাম দিয়ে বললেন, ‘আ-আলিজু?’ ঢোকা অর্থে এই শব্দের ব্যবহার আরবী ভাষায় আছে, কিন্তু অনুমতি প্রার্থনার ক্ষেত্রে তা প্রমিত শব্দ নয়। প্রমিত শব্দ হচ্ছে, ‘আ-আদখুলু?’ তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি ‘আ-আদখুলু?’ বল এভাবে তার শব্দ-প্রয়োগ ঠিক করেছেন। অথচ তা যিকর-আযকার বা এ জাতীয় কোনো বিষয় ছিল না।

মুসলিম শরীফে তো একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ই আছে ‘কিতাবুল আলফায’ শিরোনামে। সেখানে বিভিন্ন হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শব্দপ্রয়োগ সংশোধন করেছেন, ইশার নামাযকে ‘আতামা’ বলো না, ‘ইশা’ বলো। আঙুরকে ‘করম’ বলো না, ‘ইনাব’ বলো। মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বায় ‘কিতাব আদব’-এর একটি শিরোনাম হল, ‘মান কানা ইউয়াল্লিমুহুম ওয়াদরিবুহুম আলাল লাহনি’ অর্থাৎ সন্তানকে ভাষা শিক্ষা দেওয়া এবং ভুল হলে শাসন করা প্রসঙ্গ।

এ পরিচ্ছেদে সহীহ সনদে আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, কথাবার্তায় লাহ্‌ন বা ভাষাগত ভুল হলে তিনি সন্তানদের শাসন করতেন। তদ্রূপ ‘‘শুআউল ঈমান’’ গ্রন্থে সতেরো তম শো’বা (খণ্ড ২ পৃষ্ঠা, ২৫৮) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকেও অনুরূপ বিষয় বর্ণিত আছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, দৈনন্দিন জীবনেও একজন মুমিনের ভাষা বিশুদ্ধ ও শালীন হতে হবে। এটা দ্বীনী ভাষার প্রসঙ্গ নয়, মাতৃভাষার প্রসঙ্গ। অতএব মাতৃভাষা যাই হোক তার বিশুদ্ধতার শরীয়তের কাম্য। আর এটা কখনো চর্চা ছাড়া হাসিল হবে না। অভিজ্ঞ ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চর্চা করা ছাড়া ভাষার বিশুদ্ধতা অর্জন করা কঠিন। 

প্রশ্ন : তাহলে বলা যায়, বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের সাধারণ কর্তব্য হচ্ছে বাংলাভাষার বিশুদ্ধতার বিষয়ে সচেষ্ট হওয়া। এই সাধারণ কর্তব্য ছাড়াও এক্ষেত্রে আলিম ও তালিবে ইলমদের কোনো করণীয় আছে বলে মনে করেন কি না? 

উত্তর : আমি তো শুধু গোড়ার কথাটা বলেছি। আলিম ও তালিবে ইলমদের জন্য তো বাংলা ভাষা-চর্চায় আত্মনিয়োগ করার বড় বড় কারণ রয়েছে। আমি যে কারণ বলছি, অন্যান্য কারণ না থাকলেও শুধু এই এক কারণই বাংলা ভাষা-চর্চার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যথেষ্ট। আর বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে তো প্রয়োজন শুধু ভাষা-চর্চার নয়; বরং ওই বিষয়ের, যা হযরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নাদাভী রাহ. বলে গেছেন এবং এখন তাঁর সার্থক উত্তরসূরী হযরত মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ ছাহেব বলেন, অন্যান্য বুযুর্গরাও কথাটা বলেছেন। তা হচ্ছে, বাংলা ভাষার সাধারণ চর্চা এখন যথেষ্ট নয়। এটা তো সবাই করবেন।

এখন কিছু মানুষকে বাংলা ভাষার কর্তৃত্ব হাতে নেওয়ার জন্য প্রাণপণ সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। এটা যেমন আলিমদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন তেমনি বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান ও খোদ বাংলা ভাষারও প্রয়োজন। বাংলা ভাষার শোধন, সংস্কার ও সমৃদ্ধির জন্য এ কাজ অপরিহার্য। জগতের অনেক ভাষাই মাযলূম, কিন্তু সর্বাধিক মাযলূম ভাষাগুলোর মধ্যেও বাংলা ভাষার স্থান প্রথম দিকে।

কেননা, দীর্ঘ দিন যাবৎ বাংলা ভাষার কতৃত্ব এমন লোকদের হাতে, যাদের চিন্তা-চেতনা এবং জীবন ও চরিত্র কলুষমুক্ত নয়। তাদের সাহচর্যে এ ভাষাতেও কলুষ ও অশ্লীলতা প্রবেশ করেছে। এজন্য বাংলা ভাষায় রূহ ও রূহানিয়াত এবং প্রাণ ও প্রাণময়তা সৃষ্টির জন্য এমন কিছু মানুষকে প্রাণপণ সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে হবে, যারা সমুন্নত চিন্তা-চেতনা এবং পবিত্র রুচি ও আদর্শের অধিকারী। এটি হচ্ছে ভাষার শোধন ও সংস্কারের দিক। এরপর প্রয়োজন ভাষার পুষ্টি ও সমৃদ্ধি। এ লক্ষ্যে নানামুখী কাজের প্রয়োজন। এ দিক থেকেও বাংলা ভাষা অত্যন্ত দরিদ্র। এর কারণও তা-ই যা আগে বলেছি।

একটি ভাষার ধারক-বাহকদের সামনে যখন সমুন্নত কোনো লক্ষ্য থাকে না এবং গভীর কোনো প্রেরণা দ্বারা তারা পরিচালিত হয় না তখন তা চর্চাকারীদের স্বার্থ হাসিলের উপায় হলেও ভাষা থাকে বঞ্চিত। এদিক থেকেও আলিমদের জন্য সুযোগ আছে। তারা একে দ্বীনী খেদমত হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। উপরন' তাদের সামনে নমুনা আছে।

তারা যদি খোঁজ করেন যে, আরবী ভাষায় কত ধরনের খিদমত হয়েছে তাহলে নিজেদের কাজের জন্য পর্যাপ্ত উদাহরণ তারা পেয়ে যাবেন। আরবী ভাষা স্বভাবগতভাবেই অনেক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, উপরন্তু কুরআনের ভাষা হওয়ায় এবং এর সঙ্গে দ্বীনী প্রেরণা যুক্ত হওয়ায় তার এত সেবা হয়েছে যে, গুণে, মানে ও বৈচিত্রে পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষাকেই এর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তো আলিমদের সামনে কাজের নমুনাও বিদ্যমান রয়েছে।

জালালুদ্দীন সুয়ূতী রাহ.-এর কিতাব ‘আলমুযহির ফী আনওয়াইল লুগাতি ওয়া উলূমিহা’র শুধু সূচিপত্রে নজর বুলিয়ে দেখুন, ভাষার সেবা ও পরিচর্যার কত দিক হতে পারে এ সম্পর্কে কিছুটা অনুমান হয়ে যাবে। তদ্রূপ আরবী ভাষার ইতিহাসের উপর যে দীর্ঘ গ্রন্থাবলি রচিত হয়েছে সেগুলোর পাতা উল্টিয়ে গেলেও অভিভূত হয়ে যেতে হয় যে, কাজের ক্ষেত্র কত বিস্তৃত! বাংলা ভাষায় এত বিচিত্র কাজের চিন্তাও কেউ করেনি। যাই হোক, মৌলিক দু’ একটি কথা বললাম। এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে লেখার ইচ্ছা আছে। কোনো সুযোগে লিখব ইনশাআল্লাহ। তবে আপনার প্রশ্নের উত্তরে আশা করি এটুকুই যথেষ্ট হবে। 

প্রশ্ন : আলিমরা যদি বাংলা ভাষার খেদমতে আত্মনিয়োগ করতে চান তাহলে তাদের লক্ষ্য, প্রেরণা ও কর্মপদ্ধতি কী হওয়া উচিত বলে মনে করেন? 

উত্তর : হ্যাঁ, বলেছিলাম যে, নিয়ত ও উসূল ঠিক থাকা জরুরি। কেননা, মুমিন তার সময় অযথা ব্যয় করতে পারে না। সময়-ব্যয়ের পিছনে অবশ্যই দ্বীনী প্রেরণা থাকতে হবে। বাংলা ভাষার কতৃত্ব হাতে নেওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জনের সংকল্প যদি কেউ করে তবে তো তাকে জীবন ওয়াকফ করে দিতে হবে। অতএব এখানে যদি দ্বীনী প্রেরণা না থাকে, তবে তো তার জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে গেল। আখিরাতে আল্লাহর কাছে সে কী জবাব দিবে? ‘ওয়ান উমরিহী ফীমা আফনাহ’- জীবন কোথায় ব্যয় করেছ-এই প্রশ্নের উত্তর সে কীভাবে দিবে?

এজন্য নিয়ত সহীহ করতে হবে এবং উসূল মোতাবেক মেহনত করবে হবে। নিয়তের জন্য যেমন বিশুদ্ধতা জরুরি তেমনি তাতে গভীরতা ও বিস্তৃতিও প্রয়োজন। নিয়তের বিশুদ্ধতা হল শুধু আল্লাহর জন্য হওয়া। পার্থিব কোনো হীনস্বার্থে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, দ্বীনী প্রয়োজন পূরণ, আখেরাতের শান্তি ও মর্যাদা লাভ, আল্লাহর বান্দাদের খেদমত, এভাবে উঁচু উঁচু নিয়ত ও প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে কাজ করতে হবে। আরো কী কী ফায়েদা এ কাজ দ্বারা হয় তা স্মরণ করে সেগুলোও নিয়তের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এরপর নিয়ত সহীহ হলেই চলে না কাজের পদ্ধতিও সঠিক হতে হয়।

আমি যেহেতু আল্লাহর জন্য কাজ করছি তাই যে পদ্ধতিতে কাজ করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যবে তা অনুসরণ করা আমার জন্য জরুরি। আলোচ্য বিষয়ে শরীয়তে কী কী নীতি আছে তা সব এই মুহূর্তে আলোচনা করা সম্ভব নয়, বিক্ষিপ্তভাবে কিছু নীতি উল্লেখ করছি। প্রথম নীতি হল, ভাষাকে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও বিভক্তির কারণ বানানো যাবে না। ভাষাভিত্তিক সামপ্রদায়িকতার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। তদ্রূপ ভাষা, বর্ণ, গোত্র ইত্যাদিকে মর্যাদার মাপকাঠিও বানানো যায় না। মর্যাদার মাপকাঠি হচ্ছে তাকওয়া।

কুরআন মজীদে বলা হয়েছে ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী সে যে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী’। তাই ভাষা, বর্ণ, ভূখণ্ড, গোত্র, কবীলা ইত্যাদি বিভিন্নতাকে মর্যাদা ও বন্ধুত্বের মাপকাঠি বানানো যাবে না। এসবের ভিত্তিতে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ-বিভক্তি ইসলামের শিক্ষা ও রুচির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা অত্যন্ত গর্হিত। দ্বিতীয় নীতি হচ্ছে, মানুষকে যিনি ভাবপ্রকাশের যোগ্যতা দিয়েছেন, মানুষের মুখে ও কলমে ভাষা দিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে ভাষাকে ব্যবহার করা যাবে না। তৃতীয় নীতি হচ্ছে, অশ্লীলতা ও অশালীনতার বিস্তারে ভাষাকে ব্যবহার করা যাবে না। ভাষা যিনি দান করেছেন তিনি অশ্লীলতা পছন্দ করেন না। অতএব ভাষাকে এই কাজে ব্যবহারের কোনো অবকাশ নেই।

এটা ঠিক যে, ভাষার ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করতে হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ওই ধরনের সাহিত্যও ইতিহাসের প্রয়োজন-অনুপাতে সংরক্ষণ করা হবে, কিন্তু ভাষা ও সাহিত্য চর্চার জন্য তা নবীনদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। এটি শরীয়তের একটি ফরয বিধান যে, আকীদা ও আখলাক বিনষ্টকারী কোনো সাহিত্য পাঠকের হাতে দেওয়া যাবে না।

চতুর্থ নীতি হচ্ছে, ভাষা চর্চায় নিমগ্ন হয়ে অপরিহার্য হক্বসমূহ নষ্ট করা যাবে না। যে কোনো কাজে সফলতার জন্য নিমগ্নতা জরুরি। এতে দোষ নেই, কিন্তু তা যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, খালিক ও মাখলুকের হক্বসমূহ নষ্ট করা হয় তাহলে তা আর আল্লাহর জন্য হল না। সারারাত সাহিত্য চর্চা করে যদি ফজরের নামায কাযা করে ফেলে (নাউযুবিল্লাহ) কিংবা পিতা-মাতার খেদমত, সন্তানের তরবিয়ত ইত্যাদি বিষয়ে গাফেল হয়ে যায় তাহলে এটা শরীয়ত সমর্থন করে না। এ রকম আরো নীতি আছে যেগুলোর প্রতি লক্ষ রাখা অপরিহার্য। 

প্রশ্ন : একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বইমেলার আয়োজন হয়, তদ্রূপ রবীউল আওয়াল মাসে ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের উদ্যোগে বইমেলা হয়। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? 

উত্তর : এটা ভালো উদ্যোগ। অনেক জায়গায় গিয়ে বই সংগ্রহ করা যেমন শ্রমসাধ্য তেমনি প্রচুর সময়ের প্রয়োজন। তাই এক জায়গায় একসঙ্গে অনেক বই পাওয়া গেলে সময় ও শ্রম দুটোই বেঁচে যায়। জ্ঞানচর্চার পক্ষে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। আরবেও ‘মা’রিযুল কুতুব’ নামে বইমেলা হয়ে থাকে। এখানে একটি বিষয় হল, বইমেলার বর্তমান রূপটি হয়তো নতুন, কিন্তু সহজে অনেক গ্রন্থ একত্রে প্রাপ্তির চিন্তার কিন্তু বেশ পুরানো। প্রেস আবিষকৃত হওয়ার আগের প্রাচীন ইসলামী কুতুবখানাসমূহের ইতিহাস পাঠ করলে এই মৌলিক চিন্তাটা পাওয়া যাবে। এটি ইতিহাসের একটি বিষয়। ইসলামী কুতুবখানা, ইসলামী প্রকাশনা।

মিসরে একজন প্রকাশক ছিলেন শায়খ মুনীর আবদুহূ। তার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘ইদারাতুত তিবাআতিল মুনীরিয়্যা।’ এটি মিসরের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠান। ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে কী কী কিতাব প্রকাশিত হয়েছে-এ বিষয়ে তিনি একটি কিতাব লিখেছেন নমূযাজুম মিনাল আ’মালিল খায়রিয়্যাহ ফী ইদারাতিত তিবাআতিল মুনীরিয়্যাহ । চমৎকার কিতাব। এতে সে সময়ের আদর্শ প্রকাশক, আদর্শ কিতাব-ব্যবসায়ী, ইত্যাদি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস উল্লেখিত হয়েছে এবং প্রাসঙ্গিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তাতে এসেছে। এ ধরনের আরো কিতাব আছে। এ সম্পর্কে ইনশাআল্লাহ অন্য কোনো সুযোগে আলোচনা করব।

তো বইমেলা সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হচ্ছে, এটি ভালো উদ্যোগ, তবে একে আরো সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বইমেলাও হওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক বইমেলা নামে একটি মেলা অবশ্য আমাদের এখানেও হয়, কিন্তু যদ্দূর শুনেছি, তা যথার্থ আন্তর্জাতিক নয়। কৃত্রিম আন্তর্জাতিক! সঠিক অর্থে আন্তর্জাতিক বইমেলা হওয়া দরকার। আমি কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের বইমেলা বলিনি, আন্তর্জাতিক বইমেলা বলেছি। এ ধরনের মেলা বৈরুতে হয়, মিসরে হয়, জিদ্দায় হয়, আমাদের দেশেও হওয়া দরকার। 

প্রশ্ন : আরবের ‘মা’রিযুল কুতুব’ বা বইমেলাগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য বলবেন কি? 

উত্তর : একটি ছোট বৈশিষ্ট্য হল, সেখানে ব্যবস্থাপনা খুব ভালো থাকে। সরকার বড় ভূমিকা রাখে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমি রিয়াদে থাকা অবস্থায় দেখেছি, বই মেলা শুরু হওয়ার আগেই কী কী বই মেলায় পাওয়া যাবে এবং কোন প্রকাশনীতে পাওয়া যাবে অর্থাৎ গোটা মেলার একটি তালিকা মেলার আগেই প্রকাশ করা হয়। এতে গ্রন' সংগ্রহকারীদের সুবিধা হয়। আমার জানা নেই, এখানে এরকম কোনো উদ্যোগ আছে কি না। সম্ভবত নেই। আরেকটি বিষয় হল, মেলায় যে বইগুলো যাবে তা শিক্ষা মন্ত্রণায় বা দাওয়াহ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরীক্ষা করে দেওয়া হয়। মানুষের আকীদা বা আখলাক নষ্ট করে এমন কোনো বই যেন মেলায় আসতে না পারে সেজন্য এটা অত্যন্ত প্রয়োজন। 

প্রশ্ন : অনেকে বলতে পারেন যে, এটা তো মানবাধিকার বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী? 

উত্তর : এটি মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় নয়; বরং মানবের মানবতা এবং মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষার জন্যই এটা জরুরি। যারা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তি তারা বিভিন্ন প্রয়োজনে ওইসব বই সংগ্রহ করতে পারেন, যেমন চিকিৎসককে অনেক ক্ষতিকর বিষয়ও পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ঘাঁটতে হয়। কিন্তু বইমেলা তো সবার কাছে সহজে জ্ঞানের বার্তা পৌঁছানোর জন্য। সবার হাতে কি আমরা চিন্তা ও চরিত্র বিধ্বংসী জিনিস তুলে দিব? এটা কী ধরনের যুক্তি? এজন্য সৌদী আরবের এই নিয়মটা খুবই যৌক্তিক। একটি স্বতন্ত্র বিভাগের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মেলায় বই প্রবেশের ছাড়পত্র পাবে। বইমেলায় যাতে কোনো অশ্লীল, ঈমান-আকীদা বিধ্বংসী বই প্রবেশ না করে সে ব্যবস্থা নেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতেও জরুরি। 

প্রশ্ন : সেখানের মেলাগুলো কি বিশেষ কোনো সময়ে হয়? 

উত্তর : এটা অবশ্য আমি লক্ষ করিনি। প্রতি বছর একই সময় হতে পারে বা একেক বছর একেক সময়ও হতে পারে। তবে এটা ঠিক যে, এদেশের মতো কোনো রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে হয় না। 

প্রশ্ন : আরবের বইমেলা সম্পর্কে শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর সঙ্গে আপনার কোনো স্মৃতি। 

উত্তর : হ্যাঁ, একবার মুহাম্মাদ আর রশীদ শায়খের সঙ্গে আমাকেও মেলায় নিয়ে গিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ আর রশীদ হলেন শায়খের একজন ভক্ত। বর্তমান সৌদী হুকুমতের আগে যে পরিবার ক্ষমতায় ছিল সেই আ-লুর রশীদ পরিবারের সন্তান মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ আর-রশীদ। শায়খকে দেখলাম সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা বইমেলায় ছিলেন। এরই মধ্যে বিশিষ্ট প্রকাশকদের সঙ্গে আলোচনা সারলেন এবং প্রয়োজনীয় কিতাবপত্রও সংগ্রহ করলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে বিচক্ষণতা দান করেছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে অনুমান করে ফেলতেন, কোন কিতাবটি কোন বিষয়ে তার কাজে লাগবে। খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় কিতাব সংগ্রহ করলেন। তারাই প্যাকেট করে শায়খের বাসায় পাঠিয়ে দিবে। শায়খ দাড়ালেন না। সব মিলে সর্বোচ্চ আধা ঘণ্টা। আসা-যাওয়ার সময়ও গাড়িতে ইলমী মোযাকারা। সময়ের বিষয়ে শায়খের শব্দ ছিল ‘হাত্তা নাকছিবাল ওয়াকত।’ অর্থাৎ সময়ের শুধু হেফাযত নয়, সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার ছিল শায়খের নীতি। কিতাব সংগ্রহ করতে যাচ্ছি অতএব বসে থাকলেও তো ছওয়াব হচ্ছে, কিন্তু এতে শায়খ সন্তুষ্ট থাকতেন না। সময়কে আরো কীভাবে ফলপ্রসূ করা যায় সে চেষ্টা করতেন। 

প্রশ্ন : হযরত মাওলানা আবদুর রশীদ নুমানী রাহ., শায়খুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তকী উছমানী দামাত বারাকাতুহুম, কিংবা আরো কোনো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বইমেলার কোনো স্মৃতি থাকলে বলুন। 

উত্তর : ঠিক বইমেলায় নয়, তবে বইমেলার সময়ের একটি স্মৃতি আছে শায়খ ইসমাইল আনসারী রাহ.-এর সাথে। শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. ইনে-কাল করলেন ৯ শাওয়াল ১৪১৭ হিজরীতে। এর ৪০ কি ৪১ দিন পর শায়খ ইসমাইল আনসারীও ইন্তেকাল করেন। অনেক বড় আলিম ছিলেন। রিয়াদ কেন্দ্রীয় দারুল ইফতার সদস্য ছিলেন। শায়খ আলবানী যখন বিশ রাকাত তারাবীহর বিরুদ্ধে লিখলেন তখন সালাফী আলিমদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম তার মতকে খণ্ডন করে কিতাব লেখেন-‘তাসহীহু সালাতিত তারাবীহ ইশরীনা রাকআতান।’

তদ্রূপ শায়খ আলবানীর অন্যান্য শুযূয ও বিচ্যুতিরও প্রতিবাদ করেছেন। আর্থিকভাবে তেমন স্বচ্ছল ছিলেন না। কিন্তু কিতাবের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। একবার বইমেলা থেকে মুহাম্মাদ আর-রশীদ তার জন্য কিছু কিতাব সংগ্রহ করে নিয়ে গেলেন। মেলায় আমি যাইনি তবে তাঁর কাছে যাওয়ার সময় আমাকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই কিতাবগুলোর মধ্যে একটি ছিল তাফসীরে কাশশাফের তাখরীজ। জামালুদ্দীন যায়লায়ী রাহ.কৃত তাখরীজটি তখন নতুন প্রকাশিত হয়েছে। হাফেয ইবনে হাজার এ কিতাবের যে তালখীস করেছেন-‘আলকাফিশ শাফ’ আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু যায়লায়ী রাহ.-এর ‘আলইসআফ বিতাখরীজি আহাদীছি ওয়া আছারিল কাশশাফ’ তখন নতুন প্রকাশিত হয়। আরেকটি কিতাব ছিল ‘আরূসুল আফরাহ’ বাহাউদ্দীন ছুবকী রাহ.-এর বালাগাতের বুনিয়াদী কিতাব। তো এই কিতাবগুলো পাওয়ার পর তার যে প্রতিক্রিয়া দেখেছি তা সত্যিই মনে রাখার মতো। শায়খ নুমানী রাহ. এবং শায়খ তকী উছমানী দামাত বারাকাতুহুমের সঙ্গে বইমেলার কোনো স্মৃতি এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না, তবে তাদের গ্ন্থানুরাগ ও অধ্যয়নপ্রীতি তো দীর্ঘ ইতিহাস।   

প্রশ্ন : একুশের বইমেলায় ইসলামিক ফাউণ্ডেশন ও অন্য দু’একটি প্রকাশনী ছাড়া ইসলামপন্থী প্রকাশকদের অংশগ্রহণ তেমন চোখে পড়ে না। এর কারণ কী? এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ বা মূল্যায়ন জানতে চাই। 

উত্তর : আমাদের মেলার ব্যবস্থাপকদের মধ্যে ইসলাম যে পরিমাণে আছে তারই তো বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। যিনি ভাষা দান করেছেন তাঁর কথা যারা বলে, লেখে, প্রকাশ করে তাদেরকেই তো সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, কিন্তু যখন নেয়ামত পেয়ে নেয়ামত দানকারীকে ভুলে যাওয়া হয় তখন তো এমন হবেই। দাওয়াতের কাজ দৃঢ়ভাবে করা ছাড়া এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো উপায় নেই। 

প্রশ্ন : কিছু সেক্যুলার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় যথা, সীরাত, ইসলামী ইতিহাস, তাসাওউফ ইত্যাদি বিষয়ে মৌলিক ও অনুবাদ-গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়-এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য ও পাঠকদের প্রতি কোনো পরামর্শ থাকলে জানতে চাই? 

উত্তর : এটা তো হবেই। যারা বইপত্রের প্রকাশনাকে নিছক একটি পেশা, বা খুব বেশি হলে শিল্পের বিষয় মনে করে তারা পেশার প্রয়োজনে বইপত্র প্রকাশ করবে। এরপর যার যে বিষয়ে আগ্রহ সে ওই বিষয়ের বইপত্র প্রকাশ করে। তাছাড়া মুসতাশরিক বা প্রাচ্যবিদদের ষড়যন্ত্রও আছে, যারা ইসলামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। আমাদের ইংরেজি শিক্ষিত শ্রেণীর অনেকে তাদের বইপত্র পাঠে অভ্যস্ত। তারা আলিমদেরকে নির্বোধ মনে করে। তাই নিজেদের ইচ্ছেমতো বই পড়ে। অথচ ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে, দ্বীনী ইলম কোন সূত্র থেকে গ্রহণ করছি সে সম্পর্কে সাবধান থাকা কর্তব্য। যারা নিজেরাই দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ কিংবা দ্বীনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তাদের কিতাবে আর যাই থাকুক দ্বীন যে থাকবে না তা তো স্পষ্ট।

এখানে আরেকটি বিষয়ও অবশ্য আছে। এখন তা অনেকটা কমছে। বাংলা ভাষায় আহলে হকের লিখিত বইপত্রের অপ্রতুলতা। মানুষের মধ্যে পাঠ-চাহিদা আছে। এই চাহিদা পূরণের জন্য উপকারী কিছু না পেলে ক্ষতিকর জিনিস দ্বারাই মানুষ তার নিবারণ করবে-এটাই স্বাভাবিক। এজন্য আহলে হকের দায়িত্ব আছে। তদ্রূপ পাঠকের দায়িত্ব হল, সঠিক সূত্র থেকে দ্বীন অন্বেষণের চেষ্টা করা। অতএব আবার সেই আগের কথা। যে আলিমদের থেকে বিমুখ হয়ে আজে বাজে বই পড়া শুরু করেছেন তাদের নিকটেই ফিরে যেতে হবে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী পাঠ-সামগ্রী নির্বাচন করতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। 

প্রশ্ন : শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রকাশকদের দায়-দায়িত্ব কী? লেখক-নির্বাচন, বিষয়বস্তু নির্বাচন এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে তাদের জন্য অনুসরণীয় বা অবশ্য পালনীয় কী কী বিধান ও নির্দেশনা শরীয়তে আছে? 

উত্তর : সব বিষয় কি বইমেলার সময়ই বলতে হবে? প্রকাশনা তো সারা বছরের বিষয়। অন্য কোনো সুযোগে এ সম্পর্কে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।   

প্রশ্ন : বাংলা ভাষার খেদমতের জন্য আলিম ও তালিবে ইলমদের প্রতি আপনার কোনো সংক্ষিপ্ত বার্তা বা পরামর্শ আছে কি না? 

উত্তর : হ্যাঁ, সংক্ষিপ্ত বার্তার বিষয় হলে আমি বলব, আমাদের হযরত মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ দামাত বারাকাতুহুম, যিনি সদর ছাহেব রাহ.সহ এ অঞ্চলের অন্যান্য বুযুর্গানে দ্বীনের এবং আকাবিরে দেওবন্দ ও আকাবিরে নদওয়ার রূহানী উত্তরসূরী, তাঁর দীর্ঘ সাধনা এ ময়দানে আছে, তাঁর সাহিত্য-কর্ম থেকে আমাদের উপকৃত হওয়া কর্তব্য। তাঁর সম্পাদনায় যে পত্রিকা বের হয়, মাসিক আলকলম (পুষ্প), তা সামনে রেখে সাহিত্য-চর্চায় আগ্রহীরা কাজ শুরু করতে পারেন। পুষ্পের বিগত সংখ্যাগুলি পুষ্পসমগ্র নামে এসে গেছে।

এছাড়া আরো যেসব রচনাকে তিনি সাহিত্য-সাধনার ক্ষেত্রে উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সেগুলোর মাধ্যমে সাহিত্য-চর্চা আরম্ভ করা উচিত। এতে শুধু ভাষার চর্চাই হবে না, চিন্তা-চেতনা এবং আদব-আখলাকেরও উন্নতি হবে। সাহিত্য-চর্চার দ্বারা চিন্তা ও চরিত্র বিনষ্ট হওয়ার যে আশঙ্কা এতদিন ছিল, আলহামদুলিল্লাহ তাঁর এই মেহনতের মাধ্যমে তা থেকে মুক্ত থাকার উপায় তৈরি হয়ে গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ের মেহনতের জন্য, ইনশাআল্লাহ, তাঁর সাহিত্য-কর্ম পর্যাপ্ত বা পর্যাপ্তের কাছাকাছি। এখন আর অনৈসলামিক সাহিত্যের দিকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। 

যাকারিয়া : আপনি অনেক মূল্যবান সময় আমাদেরকে দিয়েছেন। এজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। 

[ মাসিক আলকাউসার » সফর ১৪৩১ . ফেব্রুয়ারী ২০১০ ]  .


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ