Md Jahidul Islam Sumon
প্রকাশ ১৩/০২/২০২১ ০৫:০৬পি এম

গ্যাস্ট্রিক কেন হয় করণীয় এবং গ্যাস্ট্রিক নিরাময়ের উপায় সমূহ

গ্যাস্ট্রিক কেন হয় করণীয় এবং গ্যাস্ট্রিক নিরাময়ের উপায় সমূহ Ad Banner

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় যারা ভোগেন তারা ভালোই জানেন বিষয়টি কতোটা অস্বস্তিকর। একটু ভাজাপোড়া অথবা দাওয়াত-পার্টিতে মসলাযুক্ত খাবার খেলেই শুরু হয়ে যায় গ্যাসের সমস্যা, বুক বা গলায় জ্বালাপোড়া।

এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে সবাই হাত বাড়ান ওষুধের দিকে। এতে সাময়িক কিছুটা আরাম পাওয়া যায় বটে। তবে অভ্যাসটি কিন্তু আসলেই ক্ষতিকর।

চিকিৎসকদের মতে, শারীরিক প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন অ্যাসিড কমানোর ওষুধ খেলে তা আদতে ক্ষতিই করে। এর প্রভাবে কোনো ভারী খাবার খেলে অ্যাসিডের অভাবে প্রোটিন হজমে বিঘ্ন ঘটে৷

এছাড়া খাবার নিচে নামার প্রক্রিয়া শ্লথ হয়ে-পেট ভার, খাবার গলায় উঠে আসা, বমি ও বদহজমসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়।

গ্যাস্ট্রিক কেন হয় তা অনেকের জানা থাকলেও এখানে উল্লেখ করা হলো।

১. মানসিক অশান্তি- এংগজাইটি, স্ট্রেস বা মানসিক চাপ, মানসিক আঘাত প্রভৃতি গ্যাস্ট্রিকের কারণ হতে পারে।

২. অখাদ্য- অখাদ্য থেকে অধিকাংশ গ্যাস্ট্রিক হতে দেখা যায়। অনেকে বলেন না খেয়ে থাকলে গ্যাস্ট্রিক হয় যা একদমই ঠিক না। রোজার মাসে রোজাদার দীর্ঘ ১২/১৩ ঘন্টা যে কোন ধরনের খাবার থেকে বিরত থাকে তখন কারো গ্যাস্ট্রিক হতে দেখা যায় না।

বরং তখন গ্যাস্ট্রিক ভালো হয়ে যায়। এর কারণ হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অখাদ্য খাবার থেকে গ্যাস্ট্রিক হতে দেখা যায়। অখাদ্য যেমন:- কনডেন্সড মিল্ক নামক পামওয়েলের গাদ, টেষ্টিংং সল্ট, সাদা মিহি দানার লবণ, সাদা চিনি, ডালডা বা যে সকল খাদ্যের মধ্যে ডালডা আছে, কাপড়ের রং, ভেজাল মসলা, ভেজাল তৈল, অতিরিক্ত তৈল, পঁচা-বাসি, যে কোন প্রকার কেমিক্যালযুক্ত খাবার, হাইড্রোজ বা হাইড্রোজ মিশ্রিত খাবার, সোডা বা সোডা মিশ্রিত খাবার, ভেজাল তরল বা দুধ, কড়া কফি, কড়া চা প্রভৃতি।

৩. খাবারের পরিমান- আমাদের অধিকাংশরাই অতিরিক্ত খাওয়াটাকে ক্রেডিট মনে করি। শুধু খাওয়া নয় খাওয়ানোটাও উত্তম আতিথেয়তার নিদর্শন হিসেবে ধরে নেই। অথচ অতিরিক্ত খাবার গ্যাস্ট্রিকের অন্যতম কারণ।

ইসলামী নিয়ম মতে দু’বেলা আহার উত্তম এবং প্রতিবেলাতে ব্যক্তির মোট খাবারে পরিমানের ৩ ভাগের একভাগ খাবার, একভাগ পানি ও একভাগ খালি রেখে খাবার সম্পন্ন করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

৪. কথপোকথন- খাবারের সময় কথা বলা থেকে যতদূর সম্ভব বিরত থাকতে ইসলামের নীতিতে বলা হয়েছে। এমন কি খাবার গ্রহণের সময় সালাম বিনিময় থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। খাদ্য গ্রহণের সময় মনোযোগ অন্য কোন স্থানে চলে গেলে মস্তিস্ক বুঝতে পারে না প্লেটের খাবারের জন্য কতটুকু এসিড নির্গত করে পাকস্থলিতে দিতে হবে। ফলে খাদ্য পাকস্থলিতে গিয়ে নানা ধরনের বিপত্তি করে এবং হজম হতে বাধা দান করে।

৫. এক দফায় খাবার নেওয়া- হিন্দু ধর্মমতে খাবার একবারই প্লেটে নিতে হবে। বার বার প্লেটে খাবার নেওয়া যাবে না। এত নির্ধারিত খাবার দেখে মস্তিস্ক সঠিক পরিমান পাচক রস নিঃসরণ করে। অতিরিক্ত খাবার খেলে মস্তিস্কের সঠিক পরিমান পাচক রস নিঃসরণ করতে পারে না।

৬. ঘুম- ঘুম এর সমস্যার কারণে বা কোষ্টকাঠিণ্য থাকার কারণেও গ্যাস্ট্রিক দেখা দিতে পারে।

৭. লিভার ফাংশন- গ্যাস্ট্রিক দেখা দিতে পারে লিভার ফাংশন কোন কারণে গোলযোগে দেখা দিলে।

৮. ধূমপান- ধূমপান বা বিভিন্ন প্রকার ঔষধ সেবনের কারণে গ্যাস্ট্রিক হতে পারে।

উপরোক্ত কারন গুলোকে ভাল ভাবে পর্যালোচনা করে নিয়মমত খাদ্যাভাস অনুশীলন করলেই গ্যাস্ট্রিকের জন্য কোন প্রকার ঔষধ সেবণ করতে হবে না। কারণ গ্যাস্ট্রিক কোন রোগ নয়। এটা পরিপাকতন্ত্রের ব্যাঘাত জনিত একটি উপসর্গ মাত্র।

গ্যাস্ট্রিক হলে করণীয়:-

১. খাবার খাওয়ার পরে- খাবার খাওয়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়বেন না। কারণ খাবার হজম না হলে পেটে গ্যাস তৈরী করে।

২. তেল জাতীয় খাবার- ডুবো তেলে ভাজা যে কোন ধরণের তৈলাক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

৩. শাক-সবজী:- যে সবজীগুলো সহজে হজম হয় না যেমন, ব্রকলি, ফুলকপি, বাধাঁকপি, পালং শাকে থাকা রাফিনোজ নামক উপাদান পেটে গ্যাস তৈরী করে।

৪. ডাল জাতীয় খাবার:- গ্যাস হলে যে কোন ধরণের ডাল যেমন মসুরের ডাল, ছোলা-বুট, সয়াবিন ইত্যাদি খাবেন না। কারণ এগুলোতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে প্রোটিন,সুগার এবং ফাইবার যা সহজে হজম হতে চায়না এবং গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি করে।

গ্যাস্ট্রিক নিরাময়ের উপায়:

১. ব্যায়াম বা হাটাহাটি করুন- নিয়মিত ব্যায়াম অথবা সময় নিয়ে হাটাহাটির অভ্যাস করুন। এতে পেটের মধ্যে গ্যাস জমতে পারবে না।

২. দই অথবা মাঠা- দইয়ের মধ্যে রয়েছে প্রোবায়টিক উপাদান যা হজম শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে গ্যাসের ব্যথা কমিয়ে আনে।

৩. শসা- পেট ঠান্ডা রাখতে শসার তুলনা হয় না। এতে রয়েছে ফ্লেভানয়েড ও অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদান যা পেটে গ্যাসের চাপ কমিয়ে আনে এবং বুকের জ্বালা দূর করে।

৪. আদা- আদা সবচাইতে কার্যকরী অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান সমৃদ্ধ খাবার যা গ্যাসের সমস্যা দূর করে। আদা চুষে খেলে অথবা চা বানিয়ে খেলে এই কষ্ট থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

৫. লবঙ্গ- লবঙ্গ তাৎক্ষনিক গ্যাসের ব্যথা কমিয়ে আনে। ২/৩ টি লবঙ্গ মুখে নিয়ে চুষলে অথবা সমপরিমান এলাচি ও লবঙ্গ গুঁড়া খেলে অ্যাসিডিটির জ্বালা এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়।

৬. পেঁপে: পেঁপেতে রয়েছে পাপায়া নামক এনজাইম, যা হজমশক্তি বাড়ায়। নিয়মিত পেঁপে খাওয়ার অভ্যাস করলেও গ্যাসের সমস্যা কমে।

৭. কলা ও কমলা: কলা ও কমলা পাকস্থলির অতিরিক্ত সোডিয়াম দূর করতে সহায়তা করে। এতে করে গ্যাসের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এ ছাড়াও কলার সল্যুবল ফাইবারের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ক্ষমতা রাখে। সারাদিনে অন্তত দুটি কলা পেট পরিষ্কার রাখতে কাজ করে।

৮. রসুন: অ্যাসিডিটির সমস্যা কমাতে রসুনের কোনো বিকল্প হয় না বললেই চলে। এক্ষেত্রে এক কোয়া রসুন খেয়ে ফেললেই স্টমাক অ্যাসিডের ক্ষরণ ঠিক হতে শুরু করে। ফলে গ্যাস-অম্বল সংক্রান্ত নানা লক্ষণ ধীরে ধীরে কমে যেতে শুরু করে।

৯. ডাবের পানি: ডাবের পানি খেলে হজম ক্ষমতা বাড়ে এবং সব খাবার সহজেই হজম হয়ে যায়। এছাড়াও গ্যাসের সমস্যা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায় নিয়মিত ডাবের পানি খেলে। তাই সম্ভব হলে প্রতিদিন ডাবের পানি খাওয়ার অভ্যাস করুন। তাহলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে।

১০. আসন গ্রহন- খাবারের সময় পা ভাজ করে পেটে চাপ রেখে খাওয়া স্বাস্থ্যকর। এতে গ্যাস্ট্রিক হয় না। ইসলামী কায়দায় হাঁটু ভাঁজ করে খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সাময়িক গ্যাসের ব্যথার জন্য উল্লেখিত উপায়গুলো অবলম্বনের পরও যদি ব্যথা না কমে তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিন।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ