Adv.Md.Sarwar Hossain
প্রকাশ ১৯/০২/২০২২ ০৬:২৬পি এম

আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্মকথা

আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্মকথা
ad image
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) একটি স্মরণীয় দিন। বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে, স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান নিয়ে,এমন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে বাঙালি বিতর্ক করে না। সেই বিস্মৃতিপরায়ন জাতি হিসেবে আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করি, উল্লাসে এ কে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।কখনো ফুল দেওয়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে হানাহানি মারামারি ও পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দেই।কখনো মনের ভূলে ঘুম থেকে উঠে অপবিত্র অবস্থায় চলে যাই শহীদ মিনারে। আবার তার পরের দিন অনায়াসে জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে থাকি তার উপরে , ভুলে যাই একুশের ভাষা দিবসের কথা। কিন্তু আমরা সত্যিই কি জানি একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হবার ইতিহাস টুকু। আমাদের গায়ের রক্ত দিয়ে আঁকা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিগত ৯০ নব্বই শতকের শেষ দিক। সবকিছুর পুরোধা ছিল রফিকুল নামের এক কানাডা নির্বাসী বাঙালি।

চেহারা ছবিটা অসাধারণ কিছু মনে হবে না দেখলে। চিরায়ত বাঙালির চেহারা, আলাদা কোন বিশেষত্ব চোখে মুখে নেই। কিন্তু যে কেউ একটু কথা বললেই বুঝবেন যে সাধারণ এই লোকটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অমিত শক্তি স্ফুরণ।এক সময় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন করেছেন পাক বাহিনীর হাত থেকে তো এই লোকটি একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিণত করার সম্মুখ যোদ্ধ হবেন না তো কে হবেন? ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে এক রফিক পুলিশের গুলিতে প্রান দিয়ে দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে অমর করেছিলেন। তার ৪৬ বছর পর আরেক রফিক সুদূর কানাডায় বসে এক দুঃসাহসিক কাজ করে ফেললেন।

১৯৯৮ সালের ৯ ই জানুয়ারী রফিক জাতিসংঘের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি কফি আনানকে চিঠি লেখেন। এই চিঠিতে রফিক১৯৫২ সালে শহীদদের অবদানের কথা উল্লেখ করে কফি আনান কে প্রস্তাব করেন ২১ শে ফেব্রুয়ারি কে যেন আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। সে সময় সেক্রেটারি জেনারেলের প্রধান তথ্য কর্মচারী হিসেবে কর্মরত হাসান ফেরদাউস (যিনি একজন সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত) নজরে এ চিঠিটি আসে ।

তিনি ১৯৯৮ সালে২০ শে জানুয়ারী রফিককে অনুরোধ করেন নিজে না জাতিসংঘের অন্য কোনো সদস্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রস্তাব আনার ব্যবস্থা করেন। সেই উপদেশ মোতাবেক মহাযোদ্ধা আব্দুস সালাম কে সাথে নিয়ে "এ গ্রুপ অব মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওয়াল্ড নামে একটি সংগঠন দাঁড় করান। এতে একজন ইংরেজিভাষী, একজন জার্মানভাষী, একজন ক্যান্টোনিজভাষী, একজন কাচ্চিবাসী সদস্য ছিলেন। তারা আবারও কফি আনান কে “ এ গ্রুপ অফ মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অফ দা ওয়ার্ল্ ” এর পক্ষ থেকে একটি চিঠি লেখেন এবং চিঠির একটি কপি ইউএনওর ক্যানাডিয়ান এম্বাসেডর ডেভিড ফাওলারের কাছে ও প্রেরণ করেন।

এর মধ্যে একটি বছর পার হয়ে গেল। ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাসান ফেরদৌস সাহেব রফিক এবং সালামকে উপদেশ দেন ইউনেস্কোর ভাষা বিভাগের জশেফ পডের সাথে দেখা করতে। তারা জসেফ পড সাহেবের সাথে দেখা করার পর জসেফ তাদের উপদেশ দেন ইউনেস্কোর আনা মারিয়ার সাথে দেখা করতে। এই আনা মারিয়া নামের এই ভদ্রলোক মহিলাকে আমরা কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করব,কারণ এই ভদ্রমহিলা রফিক সালাম এ কাজকে অনেক সহজ করে দেন। আনা মারিয়া মন দিয়ে শোনেন এবং তাদের পরামর্শ দেন তাদের প্রস্তাবে পাঁচটি সদস্য দেশ কানাডা, ভারত,হাঙ্গেরী, ফিনল্যান্ড এবং বাংলাদেশ দ্বারা আনীত হতে হবে।

সে সময় বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন জনাব এ এস এইচ কে সাদেক এবং শিক্ষা সচিব ছিলেন কাজী রকিবউদ্দীন । পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেক্রেটারীয়েট তৎকালীন ডিরেক্টর মশিউর রহমান, ফ্যান্সে বাংলাদেশের রাষ্টদুত সৈয়দ মোজাম্মেল আলী ,ইকতিয়ার চৌধুরী ছিলেন (কাউন্সিলর), তোফাজ্জেল হক (সেক্রেটারী জেনারেলের শীর্ষ উপদেষ্টা) ।সহ আরো অনেকে এ কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তারা দিন রাত পরিশ্রম করে আরো ২৯ টি দেশ কে প্রস্তাবটির স্বপক্ষে সমর্থন আদায়ে।

অন্যান্য বাংলাদেশী এবং প্রবাসীদের কাছে ব্যাপারটি অগোচরেই ছিল। পর্দার অন্তরালে কি দুঃসাহসিক নাটক চলছিলো সেই সময়। এই উচ্চবিলাসী প্রজেক্টের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এবং কানাডার ভাঙ্কুভার শহরের কয়েক জন কেবল ব্যাপার টি জানতেন্ এবং বুকে আশা নিয়ে তারা সে সময় জাল বুনে চলেছেন প্রতিদিন।

১৯৯৯ সালের ৯ ই সেপ্টেম্বর , ইউনেস্কোর প্রস্তাব উত্থাপনের শেষ দিন। এখনো প্রস্তাব এসে পৌঁছায়নি । ও দিকে রফিক ও সালামেরা ব্যাপারটি নিয়ে বিনিদ্র রজনী অতিক্রম করে চলেছেন। টেলিফোনের সামনে বসে আছেন। কখনো চোখ রাখছেন ই-মেইলে , আসলে প্রস্তাবটির সাথে প্রধানমন্ত্রীর একটি স্বাক্ষর বাকি ছিলো। আর প্রধানমন্ত্রী তখন পার্লামেন্টে ছিলেন । পার্লামেন্টের সমর সুচীর পরে স্বাক্ষর করলে প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময় সূচী পার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা । হয়ত বা প্রস্তাবটি সময় মত ইউনেস্কো দপ্তরে পৌঁছাবে না। সব পরিশ্রমই জলে যাবে বোধহয় । প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে অনুরোধ করা হলো তিনি যেন প্রস্তাবটি সই করে ফ্যাক্স করে দেন ইউনোস্কোর দপ্তরে । অফিসের সময় সীমা শেষ হবার মাত্র এক ঘন্টা আগে ফ্যাক্স বার্তা ইউনোস্কোর সদর দপ্তরে এসে পৌঁছালো ।

১৬ ই নভেম্বর কোন অজ্ঞাত কারনে অথবা সময়াভাবে স্বপ্নের প্রস্তাবটি সেদিন উত্থাপন হলো না্ । রফিক ও সালাম হতাশায় পড়ে দিনটি কাটালেন। পর দিন ১৭ ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ ।এক ঐতিহাসিক দিন। প্রস্তাব উত্থাপন করা হলো সবার প্রথমেই । ১৮৮ টি দেশ এতে সাথে সাথে সম্মতি জানালো । কোন দেশই বিরোধীতা করলো না। এমনকি খোদ পাকিস্তান ও নয়। সর্বসম্মতিক্রমে একুশে ফেব্রুয়ারী আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে গৃহীত হলো ইউনোস্কোর সভায় । আর এভাবেই একুশে ফেব্রুয়ারী একটি আর্ন্তজাতিক দিনে পরিনত হলো । কিন্তু এত কিছুর পরে ও আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসের মুল উদ্যোক্তা রফিক ও সালাম সবার কাছেই অচেনাই রয়ে গেলেন। তাদের ত্যাগ তিতিক্ষা আর পরিশ্রম অজ্ঞাতই রয়ে গেল। কেউ জানলো না কি নিঃসীম উৎকন্টা আর আশায় পার করেছিলেন তারা ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসের শেষ কটি বিনিদ্র রজনী । কেউ জানলো না, কিভাবে সমর্থন যুগিয়ে চলছিলেন তাদের দুজনের স্ত্রী , পরিবার এবং কাছের বন্ধু বান্ধবেরা। কত অজ্ঞাতকুশীলেরাই বাংলা একাডেমি পদক , একেুশে পদক পেয়ে যান । এই অভাগার দেশে রফিক সালামেরা উপেক্ষিতই থেকে যান। তাই আসুন আমরা আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসকে যথাযথ সর্ম্মান দিতে সমাজের সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রচলণ শুরু করি। আমাদের কোমলমতি শিশুদের ভিনদেশী সংস্কৃতি না শিখিয়ে বাংলা ভাষা শিখিয়ে সালাম, বরকত ও রফিকের মত মহান ভাষা শহীদদের আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করি ও ভাষার মান সমুন্নত রাখি ।
[ লেখকঃ আইনজীবি ও মানবাধিকার কর্মী ]

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ