শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১
MR Biswajit Dhali - (Khulna)
প্রকাশ ২০/০৯/২০২১ ০৬:২২পি এম

গ্যাস সংকটের সমাধান খুঁজছে সরকার

গ্যাস সংকটের সমাধান খুঁজছে সরকার
করোনা মহামারির তীব্রতা কমার কারণে বিশ্ববাজার থেকে প্রচুর রপ্তানি আদেশ পাচ্ছেন দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা। তবে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় শিল্প কারখানায় গ্যাসের জন্য হাহাকার চলছে। অনেক কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না।

বিশেষ করে পোশাক, টেক্সটাইল কারখানাগুলোর সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। গত জুনের পর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট নিরসনে সরকার যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) গ্যাস রেশনিং (সরবরাহ সীমিতকরণ) শুরু করেছে।

সরকারের জ্বালানি বিভাগ বৈঠক করে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে চার ঘণ্টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।গতকাল রবিবার থেকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এ ছাড়া সংকট সমাধানে আরো পথ খুঁজছে সরকার।

দেশের রপ্তানি ও শিল্প খাতের কথা ভেবে আবারও এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চলের শিল্প কারখানায় গ্যাসের জন্য হাহাকার চলছে।

চাহিদা অনুসারে গ্যাস না পাওয়ায় কারখানাগুলো উৎপাদনে যেতে পারছে না। বিশেষ করে পোশাক, টেক্সটাইল কারখানাগুলোর সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। গত জুনের পর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

ফলে রপ্তানি আদেশ বাতিলের আশঙ্কা করছেন তারা। উদ্যোক্তারা বলছেন, দ্রুত গ্যাস সংকটের সমাধান না হলে সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, কোনো কোনো কারখানায় গ্যাসের চাপ ১ দশমিক ৫ পিএসআই; কোনো কোনো কারখানায় শূন্য।

নারায়ণগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে অবস্থিত টেক্সটাইল মিলগুলোতে গ্যাসের চাপ সবচেয়ে কম। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অলস পড়ে থাকছে। তিনি বলেন, বস্ত্রকলগুলো ক্যাপটিভ (নিজস্ব) বিদ্যুতে পরিচালিত হয়।

সেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কম্পিউটারাইজড মেশিনারিজ ব্যবহার হয়। গ্যাসের অব্যাহত সরবরাহ না থাকায় যন্ত্রপাতির ক্ষতি হচ্ছে।মোহাম্মদ আলী খোকন আরো বলেন, দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের মধ্যে নিটওয়্যারের ৯০ শতাংশ আর ওভেন পোশাকের ৪০ শতাংশ স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলো সরবরাহ করছে।

এর বাইরে স্থানীয় বস্ত্র খাতের পুরোটাই সরবরাহ করতে সক্ষম দেশের টেক্সটাইল মিল। স্থানীয় বস্ত্রের বাজার ৮০০ কোটি ডলারের। গ্যাস সংকটে পুরো পোশাক খাত চরম সংকটে মধ্যে পড়েছে।

গ্যাস সংকটের কারণ : গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, জুন মাস থেকে এলএনজি আমদানি কম হচ্ছে। দেশে গ্যাসের উৎপাদনও কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে গ্যাস সরবরাহে। জ্বালানি বিভাগ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি এলএনজি কেনা বন্ধ রয়েছে তাই সরবরাহ কমেছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪৩০ কোটি ঘনফুট। গত ১৬ সেপ্টেম্বর পেট্রোবাংলা সরবরাহ করে ৩০৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস। ঘাটতি ১২৬ কোটি ঘনফুট। প্রথম দিকে সরকারের নানা কার্যক্রমের কারণে দেশের দৈনিক গ্যাস উৎপাদন বেড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছিল।

তবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বিশেষ করে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অচলাবস্থার কারণে বর্তমানে তা কমে ২৪০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ২৪৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, ২০১৮ সাল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। সমুদ্রে ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের প্রতিদিন ১০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ সক্ষমতা থাকলেও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে তা ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুটে সীমাবদ্ধ থাকে। বর্তমানে তাও কমে গেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায় আমদানি করা এলএনজি থেকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আনিছুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি কমেছে। স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনা হচ্ছে না। তাই সরবরাহ কমেছে, সংকট বেড়েছে।

এর পাশাপাশি চাহিদাও বেড়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আগে যেখানে ১৮ ঘণ্টা চলত, এখন ২২ ঘণ্টা চলছে। কেউ কেউ অনুমোদিত লোডের চেয়ে তিন-চার গুণ গ্যাস ব্যবহার করছে। ফলে সংকট আরো তীব্র হয়েছে মনে হচ্ছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। সামনে এলএনজির ওপর নির্ভরতা আরো বাড়বে। তাই এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে একটা বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করতে হবে।

কারণ শিল্প চাহিদার কথা মাথায় রাখলে দাম যতই বাড়ুক, এলএনজি কিনতেই হবে। তাই স্পট মার্কেট আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মধ্যে সমন্বয় করে কেনাকাটা করতে হবে; যাতে গড়ে দাম প্রতি ইউনিট ৮ থেকে ১০ ডলার থাকে।

কমছে গ্যাসের উৎপাদন : জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ২৩০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে। বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে ২০২২-২৩ সালে দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে দিনে উৎপাদন ১৮.৪ কোটি ঘনফুট কমতে পারে।

২৩-২৪ সালে দৈনিক উৎপাদন ৪৩.৫ কোটি ঘনফুট কমে যেতে পারে। এ সময় শেভরনের অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বন্ধ হতে পারে। বিকল্প হিসেবে সরকার এলএনজির আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস এলএনজি থেকে আমদান করে মেটানো হবে বলে আশা করছে সরকার।

বিশ্বে এলএনজির চাহিদা ও দাম বেড়েছে : বাংলাদেশ দুই পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি কেনে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ও সরাসরি খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে কেনা হয়। যখন দাম কম থাকে তখন খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা লাভজনক। বর্তমানে খোলাবাজারে দাম অনেক বেশি।

ফলে আপাতত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে না সরকার। কয়েক মাস ধরে করোনার প্রকোপ কমে যাওয়ায় বিশ্বে জ্বালানির ব্যবহার বেড়ে গেছে। বেড়েছে এলএনজির চাহিদাও। বিশেষ করে জাপান, চীনের মতো দেশগুলো বেশি বেশি এলএনজি কিনছে।

ফলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এলএনজির দাম। পাশাপাশি কার্গোর ব্যবহার বেড়েছে। ফলে চাহিদা অনুসারে জাহাজ মিলছে না।এলপিজির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) একজন ব্যবস্থাপক জানান, এখন বিশ্ববাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজি ২০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক মাস আগেও ৮ থেকে ১০ ডলারে মিলেছে।

বাংলাদেশে এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিট গ্রুপের। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির ১৪টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে পেট্রোবাংলা। আরো চারটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

দরকার গভীর ও নতুন এলাকায় খনন : দেশে যেসব স্থানে গ্যাস পাওয়া গেছে তা গড়ে ৫ হাজার মিটার গভীরতায়। বিজিএফসিএলের পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্রেও এই স্তর থেকে গ্যাস মিলেছে। এই স্তরের আরো নিচে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য প্রয়োজন ডিপ ড্রিলিং বা মাটির আরো গভীরে খনন।

বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা বাপেক্সসহ বিদেশি যেসব কোম্পানি রয়েছে তাদের রিগগুলো গড়ে ৫ হাজার মিটার খনন করার ক্ষমতা রয়েছে। ৭ হাজার মিটারের বেশি গভীরতায় খনন করতে হলে নতুন রিগ কিনতে হবে বাপেক্সের জন্য। এ ছাড়া রিগ ভাড়া করে ও ঠিকাদার দিয়েও বেশি গভীরতায় খনন করা গেলে গ্যাসের নতুন মজুদের সন্ধান মিলবে বলে অনেকে মনে করেন।

দেশে একমাত্র ভোলায় দুটি গ্যাসক্ষেত্র ছাড়া আবিষ্কৃত সব ক্ষেত্রের ভূ-কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে হলো ‘অ্যান্টি ক্লেইন স্ট্রাকচার। ভোলায় আবিষ্কৃত দুটি ক্ষেত্র নতুন বৈশিষ্ট্যের ভূ-কাঠামোর স্টেটিগ্রাফিক স্ট্রাকচার’।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভোলা, বরিশাল হয়ে খুলনা এমনকি রাজশাহী পর্যন্ত এই স্টেটিগ্রাফিক স্ট্রাকচারে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পাবনার মোবারকপুর স্টেটিগ্রাফিক স্ট্রাকচারে দেশের ২৭তম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ভোলা ও পাবনার মোবারকপুর হলো বেঙ্গল বেসিনভুক্ত এলাকা।

এসব এলাকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এক সময়ের বয়ে যাওয়া দেশের প্রধান নদীগুলোর অববাহিকায় মিলছে গ্যাস। অথচ এসব স্থানে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কূপ খননের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি নেই সরকারের। ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠান ওএনজিসিও একই ধরনের ভূ-কাঠামোয় গ্যাস ও তেল পেয়েছে।

এটি মোবারকপুর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের স্টেটিগ্রাফিক স্ট্রাকচারে ইছাপুরে। এই ভূ-কাঠামো গোটা উত্তরবঙ্গে রয়েছে। সেখানেও গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে যে পরিমাণ কূপ নতুন নতুন এলাকায় খনন করা দরকার, পেট্রোবাংলা তা করছে না। ফলে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রবণতা বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘গ্যাসের সংকট তৈরি করে এলএনজি আমদানিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে বিশেষভাবে কাউকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

দেশীয় গ্যাসের পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে আমদানি করা গ্যাস দিয়ে দেশ চালাতে গেলে যে বিপুল আর্থিক ক্ষতির শিকার হবে বাংলাদেশ, তার দায় জনগণকে মেটাতে হবে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে।’

গ্যাস সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা করতে যা যা করা দরকার, সরকার সেটা করছে। আগামীতে জ্বালানি নিরাপত্তা আরো সংহত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমদানি ব্যয় বাড়ায় এলএনজি কম আনা হচ্ছিল। তাই শিল্পে সংকট দেখা দিয়েছে। এখন আবার স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ মাসের শেষ দিকে নতুন কার্গো এলে সংকটের একটা সুরাহা হবে বলে আশা করছি।’

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ