দুই বছরেও মেলেনি মুকুটের হদিস, যশোরেশ্বরী চুরি মামলার শুনানি ১৯… | আই নিউজ বিডি

দুই বছরেও মেলেনি মুকুটের হদিস, যশোরেশ্বরী চুরি মামলার শুনানি ১৯ জানুয়ারি..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক: avatar   
দুই বছরেও মেলেনি মুকুটের হদিস, যশোরেশ্বরী চুরি মামলার শুনানি ১৯ জানুয়ারি..
দুই বছরেও মেলেনি মুকুটের হদিস, যশোরেশ্বরী চুরি মামলার শুনানি ১৯ জানুয়ারি..
ছবি: সংগৃহীত
দুই বছরেও উদ্ধার হয়নি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মুকুট; সিসিটিভিতে চোর শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ, অভিযোগপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষেরও আপত্তি..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালীমন্দির থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া মুকুট চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্রের ওপর শুনানির নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। বাদীর উপস্থিতিতে অভিযোগপত্রের ওপর শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত বিচারক ছুটিতে থাকায় এবং বাদী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় রোববার (৮ নভেম্বর) শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। আগামী ১৯ জানুয়ারি শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা অপরাধ ও তদন্ত শাখার উপপরিদর্শক মাসুদ পারভেজ গত ১৭ মার্চ রেখা সরকার ও সম্রাট ফারুখ মাওলাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে অপর দুইজনের নাম উল্লেখ থাকলেও তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁদেরসহ মোট চারজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামের মৃত ছিদাম সরকারের স্ত্রী রেখা সরকার (৪০) এবং ঢাকার কদমতলী এলাকার শেখ শফি মাহমুদের ছেলে সম্রাট ফারুখ মাওলা (৪২)।

সাতক্ষীরা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মো. নাজমুল হোসেন জানান, যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরের মায়ের মুকুট চুরির মামলায় গত ১৭ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২১ এপ্রিল অভিযোগপত্রটি অনলাইনে আসে। পরবর্তী সময়ে ১০ জুন আদালতে অভিযোগপত্র উপস্থাপন করা হলে বাদীর উপস্থিতিতে শুনানির জন্য প্রথমে ১৯ আগস্ট এবং পরে ৮ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয়। রোববার বাদী আদালতে উপস্থিত না থাকায় এবং নির্ধারিত বিচারক ছুটিতে থাকায় ভারপ্রাপ্ত বিচারক মেহেদী হাসান শুনানি না করে আগামী ১৯ জানুয়ারি পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন।


মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে এসে ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে পূজা দেন। এ সময় তিনি কালীমাতার জন্য একটি সোনার মুকুট উপহার দেন। ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর দুপুর ২টা ১০ মিনিট থেকে ২টা ৩৯ মিনিটের মধ্যে আল আমিন ওরফে স্বপন নামের এক যুবক মন্দির থেকে মুকুটটি চুরি করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মন্দিরের সেবাইত ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী ঈশ্বরীপুর গ্রামের রেখা সরকার, একই গ্রামের অপূর্ব কুমার সাহা, সঞ্জয় বিশ্বাস, শ্রীফলকাটি গ্রামের পারুল বিশ্বাস এবং মন্দিরের পুরোহিত দিলীপ চক্রবর্তীকে আটক করে পুলিশ।

এ ঘটনায় মন্দিরের পক্ষ থেকে ঈশ্বরীপুর গ্রামের কালিকানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বাদী হয়ে ১২ অক্টোবর অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শ্যামনগর থানায় মামলা করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক আহম্মদ কবীর পুরোহিত দিলীপ চক্রবর্তীকে ছেড়ে দিয়ে অন্য চারজনকে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদনসহ ১২ অক্টোবর সন্ধ্যায় আদালতে পাঠান। পরদিন ১৩ অক্টোবর পরিচ্ছন্নতাকর্মী রেখা রানী সরকার চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বিচারিক হাকিম সুজাতা আমিনের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে রেখা উল্লেখ করেন, দুই লাখ টাকার প্রলোভনে তিনি মন্দিরের তালা খুলে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার আল আমিন ওরফে স্বপন নামের এক যুবককে মুকুট চুরিতে সহযোগিতা করেন। একই সঙ্গে ঢাকার কদমতলীর সম্রাট ফারুখ মাওলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন।

এরপর ওই বছরের ২১ অক্টোবর ঢাকার রামপুরা এলাকা থেকে সম্রাট ফারুখ মাওলা ও তাঁর বাবা শেখ শফি মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৩ অক্টোবর সম্রাট ফারুখ মাওলা সাতক্ষীরার বিচারিক হাকিম মহিদুল ইসলামের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

মামলার তদন্তে পুলিশ ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করলেও মুকুট চুরির ঘটনায় সরাসরি জড়িত আল আমিন ওরফে স্বপনকে শনাক্ত করতে পারেনি। এমনকি চুরি হওয়া মুকুটটিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

তদন্তকারী কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ জানান, রেখা রানী সরকার ও সম্রাট ফারুখ মাওলাকে অভিযুক্ত করে গত ১৭ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় পারুল বিশ্বাস, সঞ্জয় বিশ্বাস, অপূর্ব সাহা ও শেখ শফি মাহমুদকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। মামলায় ১৫ জনকে সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজে মূল অভিযুক্ত আল আমিন ওরফে স্বপনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং মুকুটটিও উদ্ধার করা যায়নি।

রাষ্ট্রপক্ষের জিপি অ্যাডভোকেট অসীম মণ্ডল বলেন, যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরের মুকুট চুরির ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ব্যক্তির পরিচয় তদন্তকারী কর্মকর্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মুকুটটি আদৌ স্বর্ণের, নাকি রুপার ওপর সোনালি প্রলেপ দেওয়া—সেটিও এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া পুলিশ ও সিআইডি মুকুটটি উদ্ধার করতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের একটি সর্বজনীন মন্দিরে পরিচালনা কমিটি না থাকা, মন্দিরের প্রণামি ও দানের অর্থ-সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বাদী ও পুরোহিতের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাদীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনায় মামলাটি আরও তদন্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

মামলার আরেকটি আলোচিত দিক হলো চুরি হওয়া মুকুটের প্রকৃত উপাদান ও মূল্য নির্ধারণ। ঈশ্বরীপুরের জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় রুপার ওপর সোনার জল করা ৩০ ভরি গহনা, যার বাজারমূল্য এক লাখ টাকা উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করেন বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া মুকুটটি স্বর্ণের নাকি রুপার ওপর সোনালি প্রলেপ দেওয়া—তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে মুকুটের প্রকৃত উপাদান, ওজন ও মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরের মুকুট চুরির দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মুকুট উদ্ধার, মূল চোর শনাক্ত এবং ঘটনার পূর্ণ রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। এখন আদালতে অভিযোগপত্রের ওপর শুনানি এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator