সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির জন্য সাধারণ পাসপোর্ট কিংবা ট্রাভেল পাস ইস্যু করার কোনো সুযোগ নেই। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্তাবলী মেনেই তাকে নয়াদিল্লি থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত আনতে হবে। প্রতিমন্ত্রী জানান, কোনো বিশেষ সুবিধা বা শিথিলতার মাধ্যমে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী এই বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান অবস্থান এবং তার বিরুদ্ধে থাকা গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকার আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেবে না বলেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার দাবির প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী সাধারণ নাগরিক ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের তীব্র ক্ষোভ ও দাবি রয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত গণহত্যার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা প্রতিটি শহীদের পরিবারের প্রধান দাবি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণের এই দাবির প্রতি পূর্ণ সংবেদনশীল এবং আইনি জটিলতাগুলো নিরসন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় কোনো অপরাধীকে ফেরত পাওয়ার জন্য যে সব নথিপত্র ও আইনি প্রমাণের প্রয়োজন হয়, সরকার সেগুলো যাচাই-বাছাই করছে এবং ভারত সরকারের সাথে এ বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে যাতে কোনো আইনি ফাঁকফোকর না থাকে।
এদিকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের সফর শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় করিডোর বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলটি একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঢাকা এই আঞ্চলিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংকটকে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছে। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান ছাড়া বড় কোনো অর্থনৈতিক উদ্যোগ বা কানেক্টিভিটি প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন। চীনের প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনায় তিনি এ বিষয়ে বাংলাদেশের কঠোর অবস্থানের কথা পুনরায় ব্যক্ত করেছেন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য একদিকে যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবাসন নিয়ে আইনি অবস্থান পরিষ্কার করেছে, অন্যদিকে চীনের সাথে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কের নতুন সমীকরণও সামনে এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান ছাড়া আঞ্চলিক করিডোর নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শর্তটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন ভারসাম্য নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে এই কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রয়োগ কত দ্রুত কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিচারিক অগ্রগতির বিষয়টি। একইসাথে, চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখা এখন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আগামী দিনের আঞ্চলিক রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।