চিকিৎসা ব্যয়: সাধারণ মানুষের আতঙ্ক, নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার | আই নিউজ বিডি

চিকিৎসা ব্যয়: সাধারণ মানুষের আতঙ্ক, নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
চিকিৎসা ব্যয়: সাধারণ মানুষের আতঙ্ক, নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার
চিকিৎসা ব্যয়: সাধারণ মানুষের আতঙ্ক, নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার
ছবি: সংগৃহীত
অসহনীয় চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে, যা জনমনে সুলভ স্বাস্থ্যসেবার দাবিকে আরও জোরদার করেছে।..

বর্তমান বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য এক বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে, যা অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সীমিত আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়। কোনো পরিবারের সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে, রোগের যন্ত্রণার চেয়েও মারাত্মক আকার ধারণ করে চিকিৎসার বিপুল খরচ। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্জিত সঞ্চয়টুকুও শেষ হয়ে যাচ্ছে হাসপাতাল বিল, চিকিৎসকের ফি, ওষুধপত্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আনুষঙ্গিক বাবদ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে শেষ সম্বল ভিটেমাটি, জমিজমা বিক্রি করতে হচ্ছে অথবা ধারদেনা করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ তারা সরকারি সেবার নাগালের বাইরে এবং বেসরকারি হাসপাতালের বিপুল ব্যয়ভার বহনের সামর্থ্যেরও বাইরে। ফলে, অসুস্থ প্রিয়জনের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া এবং পারিবারিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মধ্যে একটি মর্মান্তিক দ্বন্দ্বে উপনীত হতে হচ্ছে তাদের। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি একটি মৌলিক অধিকার হলেও, বাস্তবে এর ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর তদারকির অভাব সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে তুলেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার অত্যধিক ফি, ওষুধের চড়া মূল্য এবং হাসপাতালের বিভিন্ন লুকানো চার্জ জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। যখন কোনো পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন কেবল চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ই নয়, পরিবারের নিয়মিত আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে, সন্তানদের পড়াশোনা, খাদ্য, বাসস্থান এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি আকস্মিক অসুস্থতা এইভাবে একটি পরিবারকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করে। সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের সভাপতি জাফর ইকবাল এই প্রসঙ্গে বলেন, "চিকিৎসা মানুষের অধিকার, কোনো বিলাসিতা নয়।" তিনি আরও বলেন, "একজন মানুষ অসুস্থ হলে তার প্রথম চিন্তা হওয়া উচিত সুস্থ হয়ে ওঠা; কিন্তু বাস্তবতায় চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতেই তাকে দিশেহারা হতে হচ্ছে। মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয় চিকিৎসা ব্যয়ে শেষ হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।" এই মন্তব্য স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।

জাফর ইকবাল স্বাস্থ্যসেবাকে বাণিজ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে মানবিক ও জনকল্যাণমুখী করার উপর জোর দিয়েছেন। তিনি সরকারি হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি আরোপের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশে লাঘব হতে পারে। তিনি আরও বলেন, "অসুস্থতার কারণে কোনো পরিবার যেন নিঃস্ব না হয়, অর্থের অভাবে যেন কাউকে চিকিৎসাবঞ্চিত হতে না হয়—এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সবার জন্য সুলভ, মানসম্মত ও মানবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।" এই বক্তব্য স্বাস্থ্যখাতে সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বাস্তবতা হলো, মানুষের আয় সীমিত হতে পারে, কিন্তু অসুস্থতা কখনো হিসাব করে আসে না। তাই, চিকিৎসা ব্যয় যেন কোনো পরিবারের জীবনের শেষ সম্বল কেড়ে না নেয়, সে জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরিহার্য। জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা মানুষের জীবনকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে না দেয়। এই সমস্যা কেবল ব্যক্তি বা পরিবারের নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকট যা রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা উচিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator