দারিদ্র্য বিমোচনে ভারতের অভাবনীয় সাফল্য ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের… | আই নিউজ বিডি

দারিদ্র্য বিমোচনে ভারতের অভাবনীয় সাফল্য ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের দ্বিমুখী বাস্তবতা..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
দারিদ্র্য বিমোচনে ভারতের অভাবনীয় সাফল্য ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের দ্বিমুখী বাস্তবতা..
দারিদ্র্য বিমোচনে ভারতের অভাবনীয় সাফল্য ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের দ্বিমুখী বাস্তবতা..
ছবি: সংগৃহীত
২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারত প্রায় ৫০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যসীমার বাইরে নিয়ে এসেছে, যা বিশ্বব্যাপী এক নজিরবিহীন ঘটনা। তবে এই অর্থনৈতিক সাফল্যের বিপরীতে দেশটিতে সম্পদ ও আয় বৈষম্যের হার উদ্বেগজনক..

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারত প্রায় ৫০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যসীমার বাইরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক। এই সময়ের ব্যবধানে দেশটিতে চরম দারিদ্র্যের হার ২৭.১ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। চীন প্রায় চার দশকে যে পরিমাণ মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করেছিল, ভারত তুলনামূলক অনেক কম সময়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় দারিদ্র্য বিষয়ক অর্থনীতিবিদ আয়াগো ওয়ামবিলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ভোগব্যয়ের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিশেষ করে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি দারিদ্র্য হ্রাসের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া, সরকারি খাদ্য ভর্তুকি এবং বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে বিপুল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে, যা ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি বড় সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে দারিদ্র্য হ্রাসের এই পরিসংখ্যানের আড়ালে বিদ্যমান রয়েছে এক গভীর ও জটিল অর্থনৈতিক বৈষম্য, যা ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬-এর তথ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে উদার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের পর থেকে ভারতে একদিকে যেমন জাতীয় প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, অন্যদিকে সম্পদ কুক্ষিগত হওয়ার প্রবণতাও সমানতালে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমালোচকদের মতে, দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠে আসা মানুষের একটি বড় অংশ এখনও নিম্ন-মধ্যম আয়ের সীমানায় অবস্থান করছে, যাদের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত ভঙ্গুর। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, বিশাল জনসংখ্যার কারণে দরিদ্র মানুষের প্রকৃত সংখ্যা এখনও বিশ্বে সর্বোচ্চ, ফলে ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক ধাক্কাতেই এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ পুনরায় দারিদ্র্যের চক্রে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উচ্চহার এবং অন্যদিকে আয়ের চরম অসম বণ্টন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে দীর্ঘস্থায়ী শঙ্কা তৈরি করেছে।

ভারতের এই অভূতপূর্ব সাফল্যের বিষয়ে সরকারি ও আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই অর্জনকে প্রজন্মের উত্থান হিসেবে অভিহিত করে সরকারের সামাজিক কর্মসূচির সাফল্যকে সামনে নিয়ে এসেছেন। আইএমএফ-এর প্রাক্তন নির্বাহী পরিচালক সুরজিৎ ভাল্লা বিশ্বব্যাংকের এই তথ্যকে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে আখ্যায়িত করে এর গ্রহণযোগ্যতাকে সমর্থন করেছেন। তবে কেরালা রাজ্যের মতো কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচনে যে সাফল্য দেখা গেছে, তা সারা দেশে সমানভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্যমূলক বিনিয়োগের কারণে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মধ্যে উন্নয়নের যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, তা ভারতের সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র ভর্তুকি দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়, বরং মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে এই অগ্রগতির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

পরিশেষে, ভারতের এই দারিদ্র্য হ্রাসের ধারা আগামী ২০২৮ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস থাকলেও, বৈষম্যের ক্রমবর্ধমান গ্রাফ দেশটির জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় না পৌঁছায় এবং আয়ের বৈষম্য নিরসনে কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার গ্রহণ করা না হয়, তবে এই সাফল্য সাময়িক উত্তরণ হিসেবেই গণ্য হবে। বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ হিসেবে ভারতের এই মডেলটি উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি পাঠ হতে পারে, তবে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করাই হবে দেশটির পরবর্তী দশকের মূল লড়াই। ভবিষ্যতে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ভারত কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই অর্জিত সাফল্যের প্রকৃত স্থায়িত্ব এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা।

No comments found


News Card Generator