ফ্রান্সে টানা তৃতীয় সপ্তাহান্তের মতো গত শনিবার লাখো মানুষ রাজপথে নেমে এসে জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় ও জরাজীর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মূলত হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন শ্রমিক ইউনিয়ন ও জলবায়ু কর্মীদের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে। ফরাসি সরকারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, যদিও আয়োজকদের দাবি অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। প্যারিসসহ ফ্রান্সের প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীরা যখন মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও বিশেষ নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশৃঙ্খলার উচ্চ ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে রাজধানী প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা ও সরকারি ভবনগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং বিক্ষোভকারীদের মিছিলের পথ শহরের প্রান্তসীমার দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষার্থীদের ভয়াবহ ভোগান্তি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনধারণের অমানবিক পরিস্থিতি। ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কোরেন্টিন ক্যাব্রু সরকারি ছাত্রাবাসের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দেয়াল ধসে পড়া এবং ইঁদুর-তেলাপোকার উপদ্রবের কথা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একইসাথে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত এক নারী জানান, তার মায়ের মতো ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করা মানুষের পক্ষে বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিক্ষোভের প্রতীক হিসেবে হ্যালোইনের পোশাককে ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারীরা মস্তকবিহীন মেরি-অঁতোয়ানেতের বেশ ধারণ করেন, যা ক্ষমতাধর শ্রেণির প্রতি জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, স্কুল ভবনগুলোর বেহাল দশা, শিক্ষকদের তীব্র ঘাটতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ায় সুবিধাবঞ্চিতদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফরাসি কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করলেও, তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার রাত পর্যন্ত ৫৬০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্যারিসের ‘প্লাস দে লা রিপাবলিক’সহ জনপ্রিয় এলাকাগুলোতে জনসাধারণের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর কারফিউ জারির চেষ্টা করা হলেও আদালত তা চলাফেরার স্বাধীনতার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে স্থগিত করেছে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, জার্মানিতে ‘জেন জি রেগেল্ট’ ব্যানারে তরুণরা ৩০টিরও বেশি শহরে বিক্ষোভ করেছে। বার্লিনে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের সামনে জড়ো হয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছেন। লারা ব্রেইটেনবাখ নামের এক শিক্ষার্থীর মতে, বর্তমান সরকার তাদের ভবিষ্যতের চেয়ে সামরিক বা অন্যান্য খাতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
ইউরোপের এই দেশগুলোতে চলমান বিক্ষোভ কেবল একটি সাময়িক প্রতিবাদ নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের অবহেলিত নীতিমালার বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল জাগরণ। ফ্রান্সের প্রতিটি অলিগলিতে এখন কেবল স্লোগান নয়, বরং পরিবর্তনের দাবি ধ্বনিত হচ্ছে। সরকার যদি দ্রুততম সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষা খাতের আমূল সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে এই অস্থিরতা পুরো মহাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবনে এই বিক্ষোভের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে শুরু করেছে, যা প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁসহ ইউরোপের অন্যান্য সরকার প্রধানদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি কেমন হবে, তা এখন পুরো বিশ্বের নজর কাড়ছে।