যিশুর প্রতি বিশ্বাস অটুট রাখায় ভারতে আদিবাসী খ্রিস্টান পরিবারের ওপর… | আই নিউজ বিডি

যিশুর প্রতি বিশ্বাস অটুট রাখায় ভারতে আদিবাসী খ্রিস্টান পরিবারের ওপর চরম নির্যাতন ও ভিটাচ্যুতি..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
যিশুর প্রতি বিশ্বাস অটুট রাখায় ভারতে আদিবাসী খ্রিস্টান পরিবারের ওপর চরম নির্যাতন ও ভিটাচ্যুতি..
যিশুর প্রতি বিশ্বাস অটুট রাখায় ভারতে আদিবাসী খ্রিস্টান পরিবারের ওপর চরম নির্যাতন ও ভিটাচ্যুতি..
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় তিনটি আদিবাসী খ্রিস্টান পরিবারের ওপর ১৫০ জনের সশস্ত্র জনতা ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে, যার ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে..

ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের কাঙ্কের জেলার দুর্গুকোন্দাল ব্লকের ভান্ডারদিগি গ্রামে গত ২১ সেপ্টেম্বর খ্রিস্টধর্মাবলম্বী তিনটি আদিবাসী পরিবারের ওপর এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছে। যিশু খ্রিস্টের প্রতি অটল বিশ্বাস বজায় রাখার অপরাধে বিকাশ সালামসহ চারজন গুরুতর আহত হন এবং তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। প্রায় ১৫০ জন উগ্রপন্থী গ্রামবাসীর একটি দল লাঠিসোঁটা ও দেশি অস্ত্র নিয়ে অতর্কিতে এই পরিবারগুলোর ওপর চড়াও হয়। হামলাকারীরা নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের ওপরও নির্মম নির্যাতন চালায় এবং তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিগত ১০ বছর ধরে তারা খ্রিস্টধর্ম পালন করে আসছেন, কিন্তু স্থানীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো গত তিন বছর ধরে ক্রমাগত তাদের ওপর ধর্মান্তরিত হওয়ার বা গ্রাম ছাড়ার চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। এই পরিকল্পিত হামলার উদ্দেশ্য ছিল ভুক্তভোগীদের ভয় দেখিয়ে তাদের পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদ করা এবং জোরপূর্বক হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করা।

ভুক্তভোগী বিকাশ সালাম ও তার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, হামলার আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছিল। ১৩ থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্তত ছয়বার গ্রাম প্রধান ও গ্রাম পরিষদের সামনে তাদের তলব করা হয় এবং বিশ্বাসের কারণে অকথ্য গালিগালাজ ও সমাজচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তাদের সরকারি রেশন সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়, যা তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল। হামলার দিন প্রায় ১৫০ জনের মদ্যপ জনতা অতর্কিতে তাদের ঘরে ঢুকে পড়ে এবং অন্ধভাবে মারধর শুরু করে। বিকাশের পিঠে লাঠির আঘাতে তা ভেঙে যায় এবং তার চাচা ও ১১ বছর বয়সী শিশুকেও নির্মমভাবে পেটানো হয়। বিকাশ সালাম জানান, বারবার ফোন করা সত্ত্বেও মাত্র দুই মাইল দূরে অবস্থিত স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ কোনো সহায়তা করতে এগিয়ে আসেনি, যা হামলাকারীদের অবাধে নির্যাতন চালানোর সুযোগ করে দেয়। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন তাদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে দিনাতিপাত করছে।

ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে স্থানীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো আদিবাসী খ্রিস্টানদের ধর্মান্তরকে ঘর ওয়াপসি বা ঘরে ফেরা বলে দাবি করে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে খ্রিস্টান নেতারা একে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ হিসেবে অভিহিত করছেন। ছত্তিশগড়ে আদিবাসী ধর্ম ও হিন্দুধর্মের পার্থক্য অস্পষ্ট করে ফেলার যে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, এই হামলার পেছনে তা অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ভুক্তভোগীরা জানান, তারা বারবার কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালেও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, উল্টো তাদের বিশ্বাস ত্যাগের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের পৈতৃক ভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কারণ তারা মনে করছেন যে গ্রামে তাদের জীবন ও বিশ্বাসের কোনো নিরাপত্তা অবশিষ্ট নেই।

এই ঘটনা ভারতের সংখ্যালঘু অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার চরম অবক্ষয়ের একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে একটি আদিবাসী পরিবারকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার যে বাস্তবতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তা স্থানীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংবিধানিক অধিকারের ওপর একটি বড় আঘাত। যদি এ ধরনের সহিংসতায় রাষ্ট্রীয় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে, তবে ভবিষ্যতে সংখ্যালঘু আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিজ ভূমিতে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং আক্রান্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হলে, তা ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কালো অধ্যায়কে আরও দীর্ঘায়িত করবে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পথকে আরও সংকীর্ণ করে তুলবে।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator