ঢাকার জনস্বাস্থ্যে চরম ঝুঁকি: আট এলাকায় বায়ুমান পর্যবেক্ষণে ‘ব্রিদিং… | আই নিউজ বিডি

ঢাকার জনস্বাস্থ্যে চরম ঝুঁকি: আট এলাকায় বায়ুমান পর্যবেক্ষণে ‘ব্রিদিং ঢাকা’ প্রকল্পের যাত্রা..

Touhid Sarkar avatar   
Touhid Sarkar
ঢাকার জনস্বাস্থ্যে চরম ঝুঁকি: আট এলাকায় বায়ুমান পর্যবেক্ষণে ‘ব্রিদিং ঢাকা’ প্রকল্পের যাত্রা..
ঢাকার জনস্বাস্থ্যে চরম ঝুঁকি: আট এলাকায় বায়ুমান পর্যবেক্ষণে ‘ব্রিদিং ঢাকা’ প্রকল্পের যাত্রা..
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর আটটি শিল্পঘেঁষা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে ‘ব্রিদিং ঢাকা’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।..

ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রেক্ষিতে রাজধানীজুড়ে বায়ুমান পর্যবেক্ষণের পরিধি বাড়াতে ‘ব্রিদিং ঢাকা’ নামক একটি বিশেষ প্রকল্পের ইনসেপশন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে আয়োজিত এই সভায় প্রকল্পের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো-এর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ঢাকার আটটি নিম্ন আয়ের, শিল্পকারখানা সংলগ্ন এবং বায়ুদূষণ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অত্যাধুনিক সেন্সর স্থাপন করা। মূলত জনবহুল ও উপেক্ষিত এলাকায় বাতাসের গুণমান নির্ণয়ের মাধ্যমে বায়ুদূষণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরাই এই প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকা বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় অবস্থান করায় জনস্বাস্থ্য যে ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে, তা মোকাবিলায় এই তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর প্রকল্পটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকল্পটি ২০২৬ সাল পর্যন্ত চলমান থাকবে এবং নিয়মিতভাবে সংগৃহীত তথ্য উন্মুক্ত রাখা হবে যাতে পরিবেশবাদী গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বায়ুদূষণের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর, যারা মূলত শিল্পাঞ্চল বা রাস্তার ধারের বস্তি এলাকায় বসবাস করেন। এই ভুক্তভোগী মানুষেরা প্রতিনিয়ত ক্ষতিকারক ধূলিকণা ও বিষাক্ত বাতাস গ্রহণ করলেও, তাদের এলাকার বায়ুমান সম্পর্কে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য বা সতর্কবার্তা পাওয়ার সুযোগ থাকে না। অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট আহমেদ ইমতিয়াজ জামি এ বিষয়ে বলেন, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় শিকার, অথচ তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য কেবল পরিসংখ্যান হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছানো হবে যেন স্থানীয় পর্যায়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আচরণের পরিবর্তন ঘটিয়ে কীভাবে দূষণ থেকে কিছুটা হলেও সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব, তা নিয়ে কাজ করাই হবে প্রকল্পের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। ভুক্তভোগীদের দাবি, কেবল পর্যবেক্ষণ নয়, বরং শিল্পকারখানার বর্জ্য নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মাণাধীন এলাকার ধুলোবালি রোধে যেন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

প্রকল্পটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে ঢাকাকে দূষণমুক্ত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পরিবেশ অধিদপ্তর ইতিমধ্যে পরিবেশ রক্ষায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, তবে তথ্যের ঘাটতি থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে তার সুফল পাওয়া যায় না। ‘ব্রিদিং ঢাকা’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও তথ্যভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা করবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, এই প্রকল্পের আওতায় সংগৃহীত বায়ুমানের তথ্য সরকার ও বেসরকারি অংশীদারদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের একটি সেতু হিসেবে কাজ করবে। তবে কেবল তথ্য সংগ্রহই যথেষ্ট নয়, বরং এই তথ্যের ভিত্তিতে শিল্পকারখানার মালিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

পরিশেষে, ‘ব্রিদিং ঢাকা’ প্রকল্পটি ঢাকার বায়ুদূষণ সংকটে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে যদি এর অর্জিত ফলাফল সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়। ঢাকার প্রতিটি কোণ থেকে আসা বায়ুমানের সঠিক চিত্র এবং তার প্রভাব বিশ্লেষণের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকরা যদি কঠোর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন, তবেই এই শহর বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠবে। বায়ুদূষণ কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী জনস্বাস্থ্য সংকটের মূল কারণ। তাই এই প্রকল্পের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে, সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবনযাত্রায় বায়ুদূষণের নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্রতর হবে। ভবিষ্যতের দূষণমুক্ত ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে এই প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা এখন সময়ের দাবি, যা কেবল গবেষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠ পর্যায়ের প্রকৃত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator