দেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসন এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রত্যয় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলো ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্স। সোমবার বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়িতে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সংগঠনটির নতুন কমিটির ঘোষণা দেওয়া হয়। বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব নাজমুল আবেদীন ফাহিমকে আহ্বায়ক এবং এম নাজমুল ইসলামকে সদস্যসচিব হিসেবে মনোনীত করে এই নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছে। দেশের ক্রীড়া অঙ্গনের বিভিন্ন স্তরের অংশীজনদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে কমিটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরা হয়, যা মূলত জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এই সংগঠনের আবির্ভাবকে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরনের সাংগঠনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, যা দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যাগুলো সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভুক্তভোগী ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াবিদরা দেশের বর্তমান ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর ধরে পেশাদারিত্বের অভাব, দলীয়করণ এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে মেধাবী অ্যাথলেটরা তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ক্রীড়া অবকাঠামো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যার ফলে প্রকৃত প্রতিভাবানরা জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার সুযোগ পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্সের নেতারা জানান, তারা মূলত মাঠ পর্যায়ের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে বের করবেন। এম নাজমুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, কেবল পদ-পদবি নয়, বরং ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে তাদের সংগঠনের মূল লক্ষ্য, যাতে অ্যাথলেটরা কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার না হন এবং মেধার ভিত্তিতেই তাদের মূল্যায়ন করা হয়।
সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি বর্তমান ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব আসিফ আকবরও ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার আহ্বান জানান। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশাসনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দূর করতে একটি শক্তিশালী নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোনো বিকল্প নেই। তবে কেবল নতুন কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়, বরং এই সংগঠনটি কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে এবং ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নীতিগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে ক্রীড়া প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার ক্রীড়াবিদদের হাতে নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা হস্তান্তর করা জরুরি।
পরিশেষে, ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্সের এই যাত্রা দেশের ক্রীড়া খাতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমী ও অ্যাথলেটদের প্রত্যাশা, এই সংগঠনটি কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবধর্মী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। যদি সংগঠনটি তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী অ্যাথলেটদের অধিকার সুরক্ষা এবং ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ফেরাতে পারে, তবে ভবিষ্যতে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যথায়, অতীতের অন্যান্য উদ্যোগের মতো এটিও কেবল নামসর্বস্ব সংগঠনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। ক্রীড়াঙ্গনের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টি অনেকাংশেই এই ধরনের নতুন উদ্যোগের সফলতার ওপর নির্ভর করছে, যা আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক ক্রীড়া সংস্কৃতিকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।