ইন্টারনেটহীন পৃথিবী ও অদৃশ্য ফ্রন্টলাইনের মহাযুদ্ধ ও আধুনিক রণকৌশলের… | আই নিউজ বিডি

ইন্টারনেটহীন পৃথিবী ও অদৃশ্য ফ্রন্টলাইনের মহাযুদ্ধ ও আধুনিক রণকৌশলের ভিন্ন সমীকরণ..

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
ইন্টারনেটহীন পৃথিবী ও অদৃশ্য ফ্রন্টলাইনের মহাযুদ্ধ ও আধুনিক রণকৌশলের ভিন্ন সমীকরণ..
ইন্টারনেটহীন পৃথিবী ও অদৃশ্য ফ্রন্টলাইনের মহাযুদ্ধ ও আধুনিক রণকৌশলের ভিন্ন সমীকরণ..
ছবি: সংগৃহীত
কেউ বা ৩রা নভেম্বরকে ঘিরে খুঁজছেন ইন্টারনেটহীন দুনিয়া আর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি।..

 

 

  • সালাউদ্দিন আকবর , ঢাকা

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ করেই শোরগোল—আগামী ৩রা নভেম্বর কিংবা ১৩ই নভেম্বর নাকি ওলটপালট হয়ে যাবে পৃথিবী! কেউ বলছেন ১৩ই নভেম্বর সায়েন্স সাময়িকীর সেই পুরোনো সমীকরণ মেনে আসবে মহাপ্রলয়, কেউ বা ৩রা নভেম্বরকে ঘিরে খুঁজছেন ইন্টারনেটহীন দুনিয়া আর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি। নাসা বা আধুনিক বিজ্ঞান এই সুনির্দিষ্ট তারিখগুলোর গুজবকে উড়িয়ে দিলেও, সমরবিদদের কপালে কিন্তু চিন্তার ভাঁজ। কারণ, ৩রা বা ১৩ই নভেম্বর হয়তো পৃথিবী ধ্বংস হবে না, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির যে চরম উৎকর্ষের ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তা যেকোনো দিন মানবসভ্যতাকে এক 'নেটবিহীন আদিম অন্ধকারে' ঠেলে দিতে পারে।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়—ভবিষ্যতের বিশ্বযুদ্ধ কেমন হবে? তবে প্রথাগত ট্যাংক মার্চ বা পরমাণু বোমার চেয়েও রোমাঞ্চকর ও ব্যতিক্রমী কিছু ফ্রন্টলাইনের কথা বলতে হবে, যা হয়তো সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।ভবিষ্যতের সেই ‘অদৃশ্য ও ব্যতিক্রমী’ যুদ্ধক্ষেত্রগুলোর রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ‘ডার্ক এজ’ বা ইন্টারনেটবিহীন দুনিয়ার যুদ্ধ 

ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রথম আঘাতটি কোনো দেশের সীমান্তে আসবে না, তা আসবে মানুষের ঘরের ভেতরে। কোনো বোমা না ফেটেও একটি দেশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে যদি তার জাতীয় গ্রিড ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক হ্যাক করা হয়। ইউনাইটেড স্টেটস সাইবার কমান্ড এবং ন্যাটোর জয়েন্ট সাইবার ডিফেন্স সেন্টারের কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রথম মিনিটেই কৃত্রিম উপগ্রহ (Satellite) ধ্বংস বা জ্যামিংয়ের মাধ্যমে জিপিএস (GPS) ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া হবে। এর ফলে বিমান চলাচল, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। নেটবিহীন এই দুনিয়ায় মানুষ অন্ধের মতো আচরণ করবে, যা যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলার জন্য যথেষ্ট।

২. সমুদ্রের তলদেশের নীরব যুদ্ধ এবং সাবমেরিন ধ্বংস 

আকাশের চেয়েও রহস্যময় এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠছে সমুদ্রের তলদেশ। বর্তমান বিশ্বের ৯৭%-এর বেশি ইন্টারনেট ডেটা প্রবাহিত হয় সমুদ্রের তলদেশে থাকা অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক থিংক-ট্যাঙ্ক ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ’-এর একটি ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে,ভবিষ্যতের যুদ্ধে প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবে এই সাবমেরিন ক্যাবলগুলো। বিশেষ ধরনের চালকবিহীন সাবমেরিন বা আন্ডারওয়াটার ড্রোন (UUV) দিয়ে এই তারগুলো কেটে দিলে মহাদেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। যে পক্ষ সমুদ্রের তলদেশের ডেটা হাইওয়ে ও সাবমেরিন ধ্বংসের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই পুরো পৃথিবীর অর্থনীতিকে নিজেদের হাতের মুঠোয় রাখতে পারবে।

৩. জলের অধিকার ও নদীর গতিপথের যুদ্ধ 

"পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধ হবে জল নিয়ে"—এই কথাটি এখন আর কেবল তত্ত্ব নয়, এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এবং ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের বৈশ্বিক পানি নিরাপত্তা সংক্রান্ত ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ওপর বিশাল বিশাল বাঁধ নির্মাণ করে কৃত্রিম বন্যা তৈরি করা কিংবা ভাটির দেশকে মরুভূমি বানিয়ে দেওয়ার রণকৌশল ডালভাত হয়ে উঠবে। শুধু তা-ই নয়, আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি (Weather Modification) বা ক্লাউড সিডিংকে সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে শত্রু দেশের আকাশে মেঘ জমতে না দিয়ে কৃত্রিম খরা তৈরি করা হবে। কোনো সামরিক আক্রমণ ছাড়াই খাদ্যসংকটে ফেলে একটি দেশকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার এই কৌশল হবে সবচেয়ে মারাত্মক।

৪. আকাশের সার্বভৌমত্ব ও মহাকাশের আর্বজনা 

আকাশের যুদ্ধ এখন আর শুধু বায়ুমণ্ডলের ভেতর ফাইটার জেটের ডগফাইটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা চলে গেছে পৃথিবীর কক্ষপথে। নাসা অরবিটাল ডেব্রি প্রোগ্রাম অফিস এবং মার্কিন ‘স্পেস ফোর্স’-এর স্ট্র্যাটেজিক ডকট্রিন অনুসারে,শত্রু দেশের গোয়েন্দা ও যোগাযোগ স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে লেজার অস্ত্র ব্যবহার করা হবে। এর ফলে মহাকাশে এত বেশি ধ্বংসাবশেষ বা আবর্জনা তৈরি হবে যে, মানুষের জন্য মহাকাশ ভ্রমণের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে (যাকে বিজ্ঞানীরা কেসলার সিন্ড্রোম বলেন)। পাশাপাশি, ঝাঁকে ঝাঁকে হাজার হাজার ছোট ড্রোন একসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সাহায্যে আকাশে উড়ে এসে যেকোনো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যূহ গুঁড়িয়ে দেবে।

৫. বিরল খনিজ এবং প্রযুক্তির আধিপত্য 

ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে সেই সব উপাদানের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার, যা ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি অচল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) এবং গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর অ্যালায়েন্সের বার্ষিক রিপোর্ট বলছে,স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে আধুনিক মিসাইলের চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজন লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং সেমিকন্ডাক্টর। এই কাঁচামালগুলোর খনি যেসব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তারাই হবে পৃথিবীর নতুন পরাশক্তি। এই খনিগুলোর দখল নিতেই প্রচ্ছন্ন যুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ার ছড়িয়ে পড়বে এশিয়া ও আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলোতে।

৩রা নভেম্বর বা ১৩ই নভেম্বরের মতো সুনির্দিষ্ট ডেটলাইন দিয়ে হয়তো বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে না, কিন্তু প্রযুক্তির এই মরণখেলা অলক্ষ্যেই শুরু হয়ে গেছে। রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘাতের চেয়ে শত্রুকে অদৃশ্যভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার এই কৌশলগুলোই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের পৃথিবীর ভাগ্য। তলোয়ারের যুগে ফেরার আগে মানবজাতিকে সম্ভবত প্রযুক্তির এই চরম অন্ধকারের মধ্য দিয়েই যেতে হবে।

 

লেখক ও প্রাবন্ধিক 

বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধ 

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator