সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুম শুরু: সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টন… | আই নিউজ বিডি

সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুম শুরু: সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ..

রবি ডাকুয়া avatar   
রবি ডাকুয়া
সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুম শুরু: সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ..
সুন্দরবনের দুবলার চরে শুঁটকি মৌসুম শুরু: সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ..
ছবি: সংগৃহীত
সুন্দরবনের দুবলার চরে পাঁচ মাসব্যাপী শুঁটকি মৌসুম শুরু হয়েছে, যেখানে ১০ হাজার জেলের অংশগ্রহণে ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বন বিভাগ। তবে বৈরী আবহাওয়া ও অবৈধ অনুপ্রবেশের শঙ্কা ঘিরে এ..

চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের দুবলার চরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে পাঁচ মাসব্যাপী শুঁটকি মৌসুম, যা চলবে আগামী বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত। আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারিকেলবাড়িয়া ও শেলার চর—এই চারটি জেলেপল্লিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই মৌসুমে ১০ হাজারের বেশি জেলে ও মৎস্যজীবীর সমাগম প্রত্যাশা করছে বন বিভাগ। চলতি মৌসুমে সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বিপরীতে বন বিভাগের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ কোটি টাকা। মৌসুমের শুরুতেই সাত হাজারের বেশি জেলে দুবলার চরে পৌঁছালেও, বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে মাছ আহরণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জেলে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে ট্রলার নিয়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ খালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, যা মৌসুমের প্রাথমিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

দুবলার চরের এই শুঁটকি বাণিজ্য হাজারো মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস হলেও, জেলেদের নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে। মৌসুম শুরুর আগেই প্রায় ১ হাজার ২০০ মাছ ধরার ট্রলার অনুমতি ছাড়াই দুবলার চরের উদ্দেশে যাত্রা করায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগী জেলে ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাগরে দস্যুতার ভয় এবং বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকিতে জীবনবাজি রেখে তাদের মাছ ধরতে হচ্ছে। এছাড়া, শুঁটকিপল্লিতে অস্থায়ী আবাসন ও মাছ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব জেলেদের ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও বন বিভাগের পক্ষ থেকে সুন্দরবনের গাছপালা ব্যবহার না করে এবং নির্ধারিত নিয়মে শুঁটকি তৈরির নির্দেশনা রয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারির অভাবে পরিবেশগত নিয়ম লঙ্ঘনের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। জেলেরা বলছেন, দস্যু বাহিনীর তৎপরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমন্বিত ঝুঁকি কাটিয়ে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা তাদের জন্য এবার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন বিভাগ জানিয়েছে, পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধ প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণ রোধে টহল জোরদার করা হয়েছে। বিভাগীয় কর্মকর্তাদের দাবি, অনুমতিপত্র ছাড়া কোনো জেলে বা ট্রলারকে দুবলার চরে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, উপকূলীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগের পাশাপাশি কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের সমন্বিত টহল প্রয়োজন। শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণে মান নিয়ন্ত্রণ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ রোধে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কঠোর মনিটরিংয়ের দাবি জানানো হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কর্তৃপক্ষ আশাবাদী হলেও, অবৈধ প্রবেশকারী ট্রলার এবং নিবন্ধিত জেলের সংখ্যার অসামঞ্জস্য দূর করা না গেলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সামগ্রিকভাবে, দুবলার চরের শুঁটকি মৌসুম দেশের মৎস্য অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি, যা প্রতিবছর প্রায় ৩২৫ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। তবে শুঁটকি উৎপাদনের এই বিপুল কর্মযজ্ঞ যেন সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না যায় এবং জলদস্যুদের হাত থেকে জেলেদের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে টেকসই শুঁটকি উৎপাদন ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। ভবিষ্যতে এই শিল্পকে আধুনিকায়ন এবং পরিবেশবান্ধব করার মাধ্যমে উপকূলীয় অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত করা সম্ভব, যার জন্য বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের আরও বেশি দায়বদ্ধ হওয়া জরুরি।

コメントがありません


News Card Generator