মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার উদ্যোগের মাঝেই জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ… | আই নিউজ বিডি

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার উদ্যোগের মাঝেই জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ পাঠদান..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক: avatar   
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার উদ্যোগের মাঝেই জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ পাঠদান..
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার উদ্যোগের মাঝেই জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ পাঠদান..
ছবি: সংগৃহীত
জরাজীর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান, দুই-তিন বছরে নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস শিক্ষা কর্মকর্তার..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:

সাতক্ষীরায় প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামোগত সংকট ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। জেলার ১ হাজার ৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫০টির ভবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব জরাজীর্ণ ভবনেই প্রতিদিন পাঠদান চলছে। এতে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক-কর্মচারী ও ৩৬ হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা। কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও দেওয়ালের প্লাস্টার উঠে বেরিয়ে এসেছে ইট, আবার কোথাও মরিচাপড়া টিন ও নষ্ট কাঠামোর নিচে চলছে পাঠদান। বর্ষায় জলাবদ্ধতা, গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম আর জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ—সব মিলিয়ে নিরাপদ ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হাজারো শিশু।

সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভবন সংস্কার কিংবা নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানানো হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান করতে গিয়ে একদিকে যেমন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুর্ঘটনার আতঙ্ক বিরাজ করছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও ভর্তির সংখ্যাও কমছে। অথচ মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার যখন নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কুলতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির বর্তমান ভবন নির্মিত হয় ২০০৩ সালে। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ব্যবহৃত ভবনটি এখন অত্যন্ত জরাজীর্ণ। ছাদের পলেস্তারা ও দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে। কোথাও কোথাও দেওয়ালের ইট বেরিয়ে এসেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই বিদ্যালয়ের মাঠ ও যাতায়াতের রাস্তায় পানি জমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হুমায়ুন কবির জানান, নানা সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্যেও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর ভালো ফলাফল করছে এবং বৃত্তি পাচ্ছে। কিন্তু নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ ও যাতায়াতের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থী সংখ্যা ক্রমেই কমছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান করতে গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সব সময় উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন তিনি।

একই উপজেলার শহরের দক্ষিণ ঘোষপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। ভবনের ঝুঁকি এতটাই বেশি যে, বিগত নির্বাচনে বরাদ্দ পাওয়া অর্থ দিয়ে সামান্য সংস্কারকাজ করে কোনো রকমে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব সংস্কার স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। তাঁদের দাবি, যেকোনো সময় ছাদের পলেস্তারা কিংবা ভবনের অন্য কোনো অংশ খসে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

অন্যদিকে সদর উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কুলপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র আরও করুণ। বিদ্যালয়টি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি। নিচু এলাকায় অবস্থিত টিনশেড ভবনটির টিন ও কাঠের কাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় শিক্ষার্থীদের প্লাস্টিকের টুলে বসে ক্লাস করতে হয়। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষের ভেতরেও পানি ও ভোগান্তি তৈরি হয়। বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়টি পানিতে ডুবে থাকে। আবার গরমের সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা কঠিন হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে গাছের নিচে ক্লাস নিতে হয়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাজান আলী জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যালয়ের ভবন, আসবাবপত্র ও যাতায়াত ব্যবস্থার সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানান তিনি।

সরেজমিনে এসব বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিরাপদ শ্রেণিকক্ষের অভাবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। অভিভাবকদের মধ্যেও সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে জরাজীর্ণ ছাদ, দুর্বল দেওয়াল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর কারণে পাঠদান চলাকালে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় শুধু শিশুদের শিক্ষার প্রথম ধাপ নয়, তাদের নিরাপদ সামাজিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অথচ বিদ্যালয়ের ভবনই যদি শিশুদের জন্য নিরাপদ না হয়, তাহলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে পড়বে। অবকাঠামোগত সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে শিক্ষার মান ও প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় জরাজীর্ণ ভবনগুলো শুধু সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত ঝুঁকি নিরূপণ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল। বিশেষ করে যেসব ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী, সেগুলোতে বিকল্প নিরাপদ শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করাও জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমীন জানান, জেলার ১ হাজার ৯৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২৫০টি বিদ্যালয়ের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক-কর্মচারী ও ৩৬ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও জানান, অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো জরুরি তহবিল থেকে পাওয়া সীমিত অর্থ দিয়ে সামান্য মেরামত করে কোনো রকমে চালু রাখা হচ্ছে। তবে এসব মেরামত স্থায়ী সমাধান নয় এবং এতে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।

সার্বিকভাবে সাতক্ষীরার ২৫০টি ঝুঁকিপূর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র কেবল অবকাঠামোগত দুরবস্থার বিবরণ নয়, এটি শিশুদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার অধিকার রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আগামী দিনের নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

没有找到评论


News Card Generator