সুন্দরবনে ফের জলদস্যুদের রাজত্ব! কার্ডের নামে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও… | আই নিউজ বিডি

সুন্দরবনে ফের জলদস্যুদের রাজত্ব! কার্ডের নামে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও মুক্তিপণে জিম্মি বনজীবীরা..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক: avatar   
শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক:
সুন্দরবনে ফের জলদস্যুদের রাজত্ব! কার্ডের নামে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও মুক্তিপণে জিম্মি বনজীবীরা..
সুন্দরবনে ফের জলদস্যুদের রাজত্ব! কার্ডের নামে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও মুক্তিপণে জিম্মি বনজীবীরা..
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আবারও জলদস্যুদের বেপরোয়া তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আবারও জলদস্যুদের বেপরোয়া তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জেলে-বাওয়ালিদের অপহরণ, নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি অগ্রিম ‘কার্ড’ বা টোকেনের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সাতক্ষীরার উপকূলীয় বনজীবীরা। জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হলে একাধিক জলদস্যু দলের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের। কোনো দলের কথিত কার্ড না থাকলে অপহরণ করে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

বনজীবীদের অভিযোগ, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে শর্তসাপেক্ষে ৫২ জন জলদস্যুর আত্মসমর্পণ ও সাধারণ ক্ষমার পরও সুন্দরবনে অপরাধমূলক তৎপরতা কমেনি; বরং নতুন করে দস্যুদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। তাঁদের দাবি, বর্তমানে সাতক্ষীরার পশ্চিম সুন্দরবনে ৮ থেকে ১০টি জলদস্যু দল সক্রিয় রয়েছে। এসব দলের কাছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। ফলে সুন্দরবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বন বিভাগের নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বনজীবীদের ভাষ্য, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে জলদস্যুদের বিভিন্ন দলের কাছে অগ্রিম টাকা দেওয়ার চাপ বেড়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ থেকে ৭টি জলদস্যু দল পর্যায়ক্রমে ১৫ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করে বনজীবীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে। প্রতিটি দলের জন্য ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম ‘কার্ডের’ নামে দিতে হচ্ছে। শ্যামনগর উপকূলের প্রায় ২০ হাজার জেলে-বাওয়ালি এ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি তাঁদের।

বনজীবীদের অভিযোগ, নির্ধারিত কোনো দলের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা না থাকলে সুন্দরবনে প্রবেশের পর জেলেদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে তাঁদের পরিবারের কাছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেক জেলে-বাওয়ালি জীবিকার প্রধান অবলম্বন সুন্দরবনে যেতেও ভয় পাচ্ছেন। কেউ কেউ পেশা পরিবর্তনের চিন্তা করছেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সুন্দরবনে জলদস্যুদের ভয়ে বনজীবীদের যাতায়াত কমে যাওয়ার একটি চিত্র উঠে এসেছে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের পারমিটসংক্রান্ত তথ্যে। বনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে রাজস্ব পরিশোধ করে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৮০০টি নৌকা সুন্দরবনে প্রবেশের পারমিট নিত, সেখানে চলতি সপ্তাহে পারমিট নিয়েছে মাত্র ১৫০টি নৌকা।

পারমিট গ্রহণের এই বড় ধরনের পতন সুন্দরবননির্ভর উপকূলীয় জনপদের অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মাছ, কাঁকড়া ও বনজ সম্পদ আহরণের ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবার এখন আয়-রোজগার নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। সুন্দরবনে যেতে না পারলে এসব পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সুন্দরবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তাঁদের অভিযোগ, বন বিভাগের অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশকারী জেলেদের শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার করা হলেও বন বিভাগের কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকা থেকেও বনজীবীদের অপহরণের ঘটনা ঘটছে।

বনজীবীদের প্রশ্ন, সুন্দরবনে প্রবেশকারী সাধারণ জেলেদের গতিবিধি শনাক্ত করতে যদি প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব হয়, তাহলে আধুনিক অস্ত্রধারী জলদস্যুদের অবস্থান শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না কেন? আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের পুনর্বাসন, নজরদারি এবং অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

জলদস্যুদের অবাধ বিচরণ শুধু বনজীবীদের জীবন-জীবিকা নয়, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বনজীবীদের আশঙ্কা, নিজেদের অবস্থান গোপন রাখা, চলাচলের পথ নিরাপদ করা কিংবা অপরাধের আলামত আড়াল করতে দস্যুরা বাঘ, হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকার বা হত্যার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

এতে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল এবং পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জলদস্যু দমনের বিষয়টিকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে বন সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেও বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

এ পরিস্থিতিতে জলদস্যুমুক্ত সুন্দরবন নিশ্চিত করার দাবিতে প্রতিবাদে নেমেছেন উপকূলীয় গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামের জেলেরা। এক দফা, এক দাবি—জলদস্যুমুক্ত নিরাপদ সুন্দরবন—এই স্লোগানকে সামনে রেখে তাঁরা ধারাবাহিক পাঁচ দিনের প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। কর্মসূচির সমন্বয় করছেন গাবুরার তরুণ নেতা ও সাতক্ষীরা জেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন লিটন। তাঁদের এই আন্দোলনের দাবি ইতোমধ্যে সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে রোববার (১ নভেম্বর) শ্যামনগর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন এবং শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে ৩ নভেম্বর সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

বনজীবীদের মতে, সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। প্রায় ৬ হাজার ৬০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত বাংলাদেশের সুন্দরবনের সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। অথচ নিরাপত্তাহীনতার কারণে সেই বনেই এখন জীবিকার সন্ধানে যাওয়া মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে বন ও পরিবেশমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন জেলে-বাওয়ালিরা।

তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে—সুন্দরবনে সক্রিয় জলদস্যু দলগুলোর অবস্থান শনাক্ত করে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার, বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের অপরাধে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি তদন্ত করা। পাশাপাশি সুন্দরবনে প্রবেশকারী জেলে-বাওয়ালিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা চালুরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

উপকূলের মানুষের প্রত্যাশা, সুন্দরবনকে ঘিরে গড়ে ওঠা জলদস্যুদের কথিত ‘কার্ড বাণিজ্য’ ও অপহরণ-মুক্তিপণের চক্র ভেঙে দিয়ে বনজীবীদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। তাঁদের একটাই দাবি—জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে গিয়ে আর কোনো জেলেকে যেন জলদস্যুদের হাতে জিম্মি ও অপহরণের শিকার না হতে হয়।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator