চাঁদপুর সদর উপজেলায় অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে খাদ্যপণ্য উৎপাদন এবং বিএসটিআইয়ের ভুয়া বিজ্ঞাপন ব্যবহারের অপরাধে দুটি বেকারিকে মোট ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ নাজমুল হুদা। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অনিয়মকারী খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের আওতায় আনা। অভিযানের সময় সদর উপজেলার চিত্রলেখা মোড় এবং ছোটলেখা মোড় এলাকায় অবস্থিত দুটি বেকারিতে ভয়াবহ নোংরা পরিবেশ ও লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রমের চিত্র ফুটে ওঠে, যা জননিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এই অভিযানে জেলা পুলিশের একটি চৌকস দল এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাব চাঁদপুর জেলা শাখার প্রতিনিধিরা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন।
অভিযান চলাকালীন চিত্রলেখা মোড়ে অবস্থিত হংকং ব্রেড অ্যান্ড বিস্কিট বেকারি থেকে বিএসটিআইয়ের ভুয়া বিজ্ঞাপন ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। বেকারিটিতে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল, যেখানে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই ছিল না। এই গুরুতর অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং ত্রুটি সংশোধন না করা পর্যন্ত বেকারিটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এই বেকারিগুলো মানহীন ও ভেজাল পণ্য বাজারে সরবরাহ করে আসছিল। ছোটলেখা মোড়ে অবস্থিত অপর একটি লাইভ বেকারিতেও একই ধরনের পরিস্থিতি পাওয়া গেছে। সেখানে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়া খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করার অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ভুক্তভোগী সাধারণ ক্রেতাদের দাবি, অধিকাংশ বেকারিই রাতের অন্ধকারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অস্বাস্থ্যকর উপাদানে বিস্কুট, পাউরুটি ও কেক তৈরি করে, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নামমাত্র জরিমানা করে এসব অসাধু ব্যবসায়ীকে থামানো সম্ভব নয়, যদি না তাদের নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন যে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের এ ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হবে। হংকং ব্রেড অ্যান্ড বিস্কিট বেকারিটি আপাতত বেকারি মালিক সমিতির জিম্মায় রাখা হয়েছে, যাতে তারা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই উৎপাদন কার্যক্রম চালু করতে না পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা এবং সরকারি অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। অভিযানে অংশ নেওয়া কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিনিধি মো. বিপ্লব সরকার বলেন, নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়নে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অনেক ব্যবসায়ী লাইসেন্স নবায়ন না করেই বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা ভোক্তা অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ পুনরাবৃত্তি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চাঁদপুরের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই অভিযান একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হলেও, দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে হলে নিয়মিত তদারকির বিকল্প নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য সেবনের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পানিবাহিত ও খাদ্যবাহিত বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই অভিযান সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা সচেতনতা তৈরি করলেও, অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালতই যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে এই ধরনের নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এবং ভেজাল রোধে প্রশাসনের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে বলে আশা করা যাচ্ছে। পরিশেষে, অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রতি প্রশাসনের এই কঠোর বার্তা পরিবহন ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে একটি স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।