বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন খুড়িয়াখালী, সোনাতলা ও রাজাপুর গ্রামে বাঘের উপস্থিতি নিয়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত রোববার রাতে ভোলা নদীর চরে একটি মৃত গরুর দেহাবশেষ এবং বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই ভীতির সূত্রপাত হয়। স্থানীয়দের ধারণা, সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ঢুকে পড়া কোনো বাঘ গরুটিকে শিকার করেছে। সোমবার সকাল থেকে বাঘের পায়ের ছাপের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে আশপাশের তিনটি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। বাঘের সম্ভাব্য বিচরণ ঠেকাতে গ্রামবাসী রাত জেগে পাহারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবীরা এলাকাটিতে মাইকিং করে সার্বক্ষণিক সতর্কবার্তা প্রচার করছেন। ঘটনার পর থেকে জনশূন্য চরাঞ্চল ও বনঘেঁষা এলাকাগুলোতে মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে, যা জনজীবনে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি করেছে।
ভুক্তভোগী গ্রামবাসী ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সুন্দরবনের সাথে লোকালয়ের কোনো স্থায়ী সীমানা বা বেষ্টনী না থাকায় বাঘ ও হরিণের মতো বন্যপ্রাণী প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসে, যা তাদের জন্য নিত্যদিনের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলম হাওলাদার, যিনি ওয়াইল্ড টিমের ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে কর্মরত, তিনি জানান যে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঘের পায়ের ছাপ শনাক্ত করা হয়েছে। গ্রামবাসীর অভিযোগ, বন সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরালো না থাকায় এবং লোকালয় ও বনের মধ্যবর্তী সীমানা অরক্ষিত হওয়ায় বাঘের মতো হিংস্র প্রাণীর লোকালয়ে ঢুকে পড়া সহজতর হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে চলাচল করতে গিয়ে তারা সবসময় প্রাণহানির আশঙ্কায় থাকছেন এবং গবাদি পশুর নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। তাদের মতে, নিয়মিত টহলের পাশাপাশি স্থায়ী কোনো সুরক্ষাবলয় ছাড়া এই ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রাপ্ত আলামত অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে বাঘটি পুনরায় সুন্দরবনের গভীরে ফিরে গেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বাঘটি আর লোকালয়ে ফিরে আসবে না এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। বন বিভাগের পক্ষ থেকে স্থানীয়দের রাতে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং কোনো অবস্থাতেই বাঘের ক্ষতি না করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগ ও ওয়াইল্ড টিমের সদস্যরা যৌথভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। বন কর্তৃপক্ষের দাবি, লোকালয়ের সাথে বনের ভৌগোলিক নৈকট্য থাকায় মাঝে মাঝেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তবে বন বিভাগের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং কোনো এলাকায় বাঘের দেখা পাওয়া মাত্রই দ্রুত খবর দেওয়ার জন্য গ্রামবাসীদের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সুন্দরবনের বাঘের এই আকস্মিক পদচারণা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বন্যপ্রাণী ও মানুষের সহাবস্থানের চরম ঝুঁকির বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘমেয়াদী এই সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। বন্যপ্রাণী ও লোকালয়ের সীমানা চিহ্নিত করার পাশাপাশি বন বিভাগের নিয়মিত তদারকি এবং স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। যদি এই আতঙ্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগকে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কেবল আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে প্রবেশ রোধে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।