বোয়ালমারীর দাদুড়িয়া বিলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ‘পলো বাওয়া’ উৎসব অনুষ্ঠিত .. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বোয়ালমারীর দাদুড়িয়া বিলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ‘পলো বাওয়া’ উৎসব অনুষ্ঠিত ..

Faridpur Desk avatar   
Faridpur Desk
বোয়ালমারীর দাদুড়িয়া বিলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ‘পলো বাওয়া’ উৎসব অনুষ্ঠিত ..
বোয়ালমারীর দাদুড়িয়া বিলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ‘পলো বাওয়া’ উৎসব অনুষ্ঠিত ..
ছবি: সংগৃহীত
ইকবাল হোসেন লিমন, বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:

 

ভোরের আলো ফুটতেই হাতে পলো, হুসা আর জাল নিয়ে বিলপাড়ে মানুষের ঢল। কারও মুখে লোকজ গান, কারও চোখে মাছ শিকারের প্রত্যাশা। দল বেঁধে বিলের পানিতে পলো চাপিয়ে মাছ ধরার চিরচেনা দৃশ্য যেন ফিরিয়ে আনল গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য। তবে উৎসবের আনন্দের মাঝেও ছিল হতাশা। বিলে আশানুরূপ মাছ না পেয়ে অনেককেই ফিরতে হয়েছে খালি হাতে।

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ও শেখর ইউনিয়নের দাদুড়িয়া বিলে সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘পলো বাওয়া’ উৎসব। বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা শত শত মানুষ এতে অংশ নেন। আর বিলের চারপাশে মাছ শিকারের এ দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন হাজারো দর্শনার্থী।

চতুল, ধুলপুকুরিয়া, দুর্গাপুর, তেলজুড়ি, নিধিপুর, পোয়াইল, বাবুর বাজার, শেখর, রাজাপুর, কলারণ, মধ্যেরগাতি, ছোলনা, গুনবহা, কুশাডাঙ্গা, লোকনাথ ও আঁধারকোঠাসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দেন। কেউ পলো, কেউ হুসা, আবার কেউ জাল নিয়ে বিলে নামেন। পানিতে পলো চাপিয়ে মাছ ধরার পাশাপাশি একে অপরের সঙ্গে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন তাঁরা।

কিন্তু উৎসবের সেই চিরচেনা আমেজের মধ্যেও ছিল দেশীয় মাছের সংকটের বাস্তব চিত্র। মাছ শিকারিদের অভিযোগ, একসময় যে বিলে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত, সেখানে এখন মাছের দেখা মেলাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের মতে, নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর হিসেবে পরিচিত সূক্ষ্ম ফাঁসের চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার, বিলের মধ্যে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর তৈরি এবং কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।


গুনবহা গ্রামের বাসিন্দা মিকাইল বলেন, বাবা-দাদার সময়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পলো ও হুসা নিয়ে দেশীয় মাছ ধরতে এসেছি। কিন্তু আশানুরূপ মাছ না পেয়ে হতাশ হতে হচ্ছে। চায়না দুয়ারি জালের কারণে দেশীয় মাছ এখন অনেক কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই ঐতিহ্য আর দেখতে পাবে না।

আলফাডাঙ্গা থেকে মাছ ধরতে আসা আজিজুল ফকির বলেন, অনেক আশা নিয়ে দাদুড়িয়া বিলে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম ভালো মাছ পাব। কিন্তু বিলে মাছ খুব কম থাকায় আশানুরূপ মাছ ধরতে পারিনি। আগের মতো মাছ না থাকায় মন খারাপ করে ফিরতে হচ্ছে।

শাহাবুল নামের আরেক মাছ শিকারি বলেন, ভোরে পলো নিয়ে মাছ ধরতে এসেছি। কিন্তু পলো দিয়ে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। অনেকে বাঁশের কাঠামোয় মশারি কাপড় লাগানো বিশেষ ধরনের হুসা দিয়ে ছোট প্রজাতির মাছ ধরছেন। সেখানেও মাছের পরিমাণ খুবই কম।

কুশাডাঙ্গা গ্রামের ইমরান বলেন, পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রাখতে আমরা এ আয়োজন করেছি। বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখানে এসেছেন। কেউ কিছু মাছ পেয়েছেন, আবার কেউ হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এর পেছনে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বড় একটি কারণ বলে আমরা মনে করি। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে আগামী প্রজন্ম বিল-ঝিলে দেশীয় মাছের প্রাচুর্য এবং পলো বাওয়ার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ হারাবে।

আরেক মাছ শিকারি বলেন, আগে কৃষিজমিতে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম ছিল। এখন রাসায়নিক উপকরণের ব্যবহার বেড়েছে। পাশাপাশি চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারও বেড়েছে। এসব কারণে শিং, মাগুর, কৈ, বাইন, শোল, টাকি, পুঁটি, মলা ও ঢেলাসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ আগের তুলনায় কম পাওয়া যাচ্ছে বলে আমাদের ধারণা।

বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পবিত্র কুমার দাস বলেন, আমাদের কাছে দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হওয়ার বিষয়ে কোনো জরিপ নেই। তবে মাছের প্রজনন ও পোনা রক্ষায় জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। দেশীয় অনেক মাছের ডিম উপযুক্ত পরিবেশ ও বৃষ্টির পানির সংস্পর্শে ফুটে পোনা তৈরি হয়। কিন্তু পানি জমার পরপরই সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে এসব পোনা আটকা পড়লে মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, লোকবল সংকটের কারণে আমরা নিয়মিত ও কার্যকরভাবে অভিযান পরিচালনা করতে পারছি না। চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়তে হয়।

মুকসুদপুর উপজেলায় চায়না দুয়ারি জাল জব্দের একটি অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, জালের মালিকেরা আদালতের আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জালগুলো মাছ ধরার জন্য নয়, সাপ ধরার কাজে ব্যবহারের দাবি তোলা হয়েছিল। এ ধরনের আইনি জটিলতা অভিযানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে বলে তিনি মনে করেন।

মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, কিছু ব্যবসায়ী গোপনে এসব জাল বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কারা কোথায় জাল বিক্রি করছেন, তা শনাক্ত করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের জনবল ও নজরদারির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

দাদুড়িয়া বিলের পলো বাওয়া উৎসব শুধু মাছ ধরার আয়োজন নয়- এটি গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন ও লোকজ সংস্কৃতির অংশ। প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজনে বিভিন্ন এলাকার মানুষ একত্র হন। কিন্তু বিলে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে উৎসবের আকর্ষণও একসময় হারিয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় মাছ শিকারিদের অভিযোগ, দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাছের প্রকৃত অবস্থা জানতে বৈজ্ঞানিক জরিপ ও নিয়মিত নজরদারি জরুরি।

বিলের পানিতে পলো চাপিয়ে মাছ ধরার সেই চিরচেনা দৃশ্য এবারও মানুষের মনে আনন্দ জাগিয়েছে। তবে মাছ না পাওয়ার হতাশা একটি প্রশ্ন রেখে গেছে-দেশীয় মাছ ও গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য কি আগামী প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে?

Nema komentara


News Card Generator