গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকায় অবস্থিত করিউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বুধবার দুপুরে এক মর্মান্তিক যৌন নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। সাত বছর বয়সী প্রথম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ সময় ধরে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রিন্সিপাল মুসলেউদ্দিনের বিরুদ্ধে। ঘটনার দিন দুপুরে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেন। এ সময় উপস্থিত জনতা এবং ক্ষুব্ধ অভিভাবক চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেন এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও শিক্ষকদের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের ভাষ্যমতে, প্রায় তিন দিন আগে মাদ্রাসা চলাকালীন সময়ে ওই শিক্ষক শিশুটিকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে অশালীন কর্মকাণ্ড চালান। ঘটনার পর থেকে শিশুটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং মাদ্রাসায় যেতে অস্বীকৃতি জানায়। শিশুটির অস্বাভাবিক আচরণ দেখে পরিবারের সদস্যরা বারবার জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সে পুরো বিষয়টি তাদের সামনে তুলে ধরে। ভুক্তভোগী শিশুটি জানায়, অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে কঠোরভাবে হুমকি দিয়েছিলেন যাতে এই ঘটনা সে কাউকে না জানায়, অন্যথায় তাকে মারধর করা হবে। এমন হুমকির মুখে শিশুটি দীর্ঘ সময় আতঙ্কিত অবস্থায় ছিল, যা তার কোমল মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। অভিভাবকরা অভিযোগ করেন, দ্বীনি শিক্ষার জন্য নিরাপদ মনে করে সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সেই শিক্ষকের কাছ থেকেই এমন জঘন্য আচরণের শিকার হতে হবে তা ছিল অকল্পনীয়।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর উত্তেজিত স্থানীয় জনতা এবং অভিভাবকরা মাদ্রাসায় জড়ো হয়ে অভিযুক্ত মুসলেউদ্দিনকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন। টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশ খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফ হোসেন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, অভিযুক্ত শিক্ষককে বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে থানায় নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পুলিশি তদন্ত চলমান রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। মাদ্রাসার মতো সংবেদনশীল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা অভিভাবক ও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছে। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো এবং অভিযুক্ত শিক্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে, শিশুদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা পরিবেশ চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।