দেবহাটায় মব হত্যাকাণ্ড: হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

দেবহাটায় মব হত্যাকাণ্ড: হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক: avatar   
শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক:
দেবহাটায় মব হত্যাকাণ্ড: হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান..
দেবহাটায় মব হত্যাকাণ্ড: হাসপাতাল থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান..
ছবি: সংগৃহীত
ভাইরাল ভিডিও-অডিও ঘিরে তোলপাড়, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের দাবি পরিবারের..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীমকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে জেলা ও জেলার বাইরে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আসাদুল ইসলাম মোল্লা ও মোক্তার হোসেন খানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিন করে রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

এদিকে ঘটনার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বক্তব্য ঘিরে অভিযুক্ত কয়েকজনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিহতের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সচেতন মহল ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচএম শাহীন জানান, গ্রেপ্তার দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে পাঁচ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে ডিজিটাল পদ্ধতিসহ বিভিন্ন কৌশলে অভিযান চলছে।

নিহত শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের ফয়জুল হক আমিনী, পারুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি হিসেবে পরিচিত সাদিকুল ইসলাম ওরফে ভদু (২৮), পারুলিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল ইসলাম গাজী (৫০), মোবারেক হোসেন মোড়ল (৪৫), আসাদুল ইসলাম মোল্লা (৪৬), মোক্তার হোসেন খান (৫৩), নাজমুল (৩০), মিজানুর রহমান মিজান (৩৮), আবুল কাশেম (৩৫) ও মো. আজাহারুল ইসলাম (২৩)।

পুলিশ জানিয়েছে, মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে কারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, তা তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

ঘটনার আগে ও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও ও বক্তব্যে ফজলুল হক আমিনী, সাদিকুল ইসলাম ওরফে ভদু এবং কামরুল ইসলাম গাজীর নাম আলোচনায় এসেছে। ভাইরাল হওয়া বক্তব্যগুলোকে কেন্দ্র করে তাঁদের গ্রেপ্তারের দাবিও জোরালো হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, শামীমকে হত্যার আগে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার হুমকিসূচক বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পরও হামলা চালানো হয়। এসব বক্তব্য ও ভিডিওর সত্যতা, প্রেক্ষাপট এবং হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখার দাবি উঠেছে।

অন্যদিকে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বৃহস্পতিবার এক ভিডিওবার্তায় দাবি করেন, শামীম হত্যার সঙ্গে তাঁর দলের কোনো নেতা-কর্মী জড়িত নন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের নেতা-কর্মীদের নাম উল্লেখ করে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, নিহত ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম বড়শান্তা গ্রামের মৃত শামছুদ্দিন সানার ছেলে। তিনি প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে মানসিক রোগে ভুগছিলেন বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।

মহানবীকে কটূক্তি করেছেন—এমন অভিযোগসংবলিত একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার সন্ধ্যায় একদল লোক তাঁর বাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় বাড়ির গেট ভাঙচুর করে ভেতরে প্রবেশ করে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে তিনি পালিয়ে কুলিয়া বাজারের ডা. এম এ সবুরের ক্লিনিকে আশ্রয় নেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে শতাধিক লোক ক্লিনিকটি ঘেরাও করে। সেখানে শামীমকে মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে তাঁকে বাইরে নিয়ে গিয়ে এলোপাতাড়ি পেটানো হয়।

পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। ওই দিন রাত ১০টার দিকে কয়েক শ লোক মিছিল নিয়ে হাসপাতালটি ঘেরাও করে বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলাকারীরা হাসপাতালের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে নেয়, বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে এবং একটি দরজা ভেঙে ওয়ার্ডে প্রবেশ করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে।

এ সময় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের জিম্মি করে শামীমকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয় বলে অভিযোগ। পরে শামীমকে মারধর করে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে রেখে হামলাকারীরা চলে যায়। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।


ঘটনার আগে ফজলুল হক আমিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শামীমের বিবস্ত্র ছবি প্রকাশ করেন এবং ফেসবুক লাইভে তাঁর পক্ষে সংবাদ প্রকাশ না করা ও জানাজায় অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া শামীমকে হত্যার বিষয়ে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধেও তাঁকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এসব বক্তব্য ও ঘটনার ধারাবাহিকতা হত্যাকাণ্ডের পূর্বপরিকল্পনা, উসকানি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ভাইরাল ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত না করে সেগুলোর সত্যতা যাচাই এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ জরুরি।

নিহতের স্বজনদের দাবি, ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের নিরাপত্তা ভেঙে কীভাবে হামলাকারীরা ওয়ার্ডে প্রবেশ করল, দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তিদের জিম্মি করার অভিযোগের সত্যতা কী এবং শামীমকে রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

একজন মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠলেও তা যাচাই ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার। অভিযোগের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ হামলা, চিকিৎসায় বাধা কিংবা কাউকে পিটিয়ে হত্যা কোনোভাবেই আইনসম্মত নয়।

শামীম হত্যা মামলায় পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনার ভিডিও-অডিওসহ প্রাসঙ্গিক আলামত পরীক্ষা এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহল।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator