শুক্রবার সকালে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনী এলাকায় দুর্গাপূজামণ্ডপগুলোতে নিজস্ব তহবিল থেকে আর্থিক অনুদান বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বেহেশতের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভোট হাতিয়ে নেওয়ার পর বর্তমানে ১১-দলীয় জোট বিরোধী দলের আসনে বসে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে। মাত্র ছয় মাস বয়সী বর্তমান সরকারের ওপর এক দফা দাবি চাপিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে তিনি হাস্যকর ও অগণতান্ত্রিক বলে অভিহিত করেন। ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার যখন নিরলস কাজ করছে, তখন বিরোধী শক্তির এমন নেতিবাচক অবস্থান দেশের স্থিতিশীলতার পরিপন্থী বলে তিনি মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে বিরোধী দলকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গঠনমূলক সহযোগিতার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর আস্থা রেখেছিল। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে কেবল রাজনৈতিক পুঁজি বা দাস হিসেবে বিবেচনা করত, কিন্তু গত নির্বাচনের মাধ্যমে সেই ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখন স্বাধীনভাবে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অধিকার অর্জন করেছে এবং বিএনপি তাদের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে। শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার রক্ষায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ আর কোনো দলের রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হতে চায় না, বরং তারা সম্মানের সঙ্গে রাষ্ট্রের মূলধারায় সম্পৃক্ত থাকতে চায়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলার ৬৫টি দুর্গাপূজামণ্ডপের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এবং বিএনপি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের আত্মার আত্মীয় হিসেবে তাদের পাশে থাকবে। কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী যাতে উৎসবের আমেজে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনকে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রাখবে। প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে, যারা অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়ে উৎসব পালনে সংকোচবোধ করতেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূজা মণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারে।
পরিশেষে, মীর শাহে আলমের এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডকে ঘিরে বিরোধী জোটের কঠোর সমালোচনা, অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের সমর্থন ধরে রাখার কৌশল—সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠছে। উন্নয়নের নামে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনসমর্থন পাওয়ার পর বিরোধী জোটের দায়িত্বহীন আচরণের যে অভিযোগ প্রতিমন্ত্রী তুলেছেন, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। পরিবহন ও অবকাঠামো খাতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও এই রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল। যদি বিরোধী দল ও সরকারি দল পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় সংকট সমাধানে একমত না হতে পারে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।