ইতিহাস ও ইসলামিক ঐতিহ্য: আন্দালুসিয়ার বিস্ময়: করডোবা মসজিদ ও ইউরোপের প্রথম আলোর গল্প.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইতিহাস ও ইসলামিক ঐতিহ্য: আন্দালুসিয়ার বিস্ময়: করডোবা মসজিদ ও ইউরোপের প্রথম আলোর গল্প..

আই নিউজ বিডি ডেস্ক  avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
ইতিহাস ও ইসলামিক ঐতিহ্য: আন্দালুসিয়ার বিস্ময়: করডোবা মসজিদ ও ইউরোপের প্রথম আলোর গল্প..
ইতিহাস ও ইসলামিক ঐতিহ্য: আন্দালুসিয়ার বিস্ময়: করডোবা মসজিদ ও ইউরোপের প্রথম আলোর গল্প..
ছবি: সংগৃহীত
ইউরোপ যখন অজ্ঞতা, গৃহযুদ্ধ আর অন্ধকারের অতল গহ্বরে ডুবে ছিল—যে সময়টিকে বিশ্ব ইতিহাসে বলা হয় ‘অন্ধকার যুগ’ (Dark Ages), ঠিক সেই সময়ে দক্ষিণ স্পেনের আন্দালুসিয়ায় জ্বলে উঠেছিল আধুনিক বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম..

করডোবার উত্থান ও ইতিহাস

৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া বংশের বীর শাসক প্রথম আবদুর রহমান (আবদুর রহমান আদ-দাখিল) এই ঐতিহাসিক মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু করেন। পরবর্তীকালে দ্বিতীয় আবদুর রহমান, দ্বিতীয় আল-হাকাম এবং আল-মনসুর তাঁদের নিজ নিজ শাসনামলে মসজিদটিকে আরও প্রসারিত ও সজ্জিত করেন। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ধাপে ধাপে নির্মিত এই স্থাপনাটি মুসলিম স্পেনের সমৃদ্ধি ও স্থাপত্যবিদ্যার উচ্চতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

স্থাপত্যের এক অপার্থিব সৌন্দর্য

করডোবা মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখ জুড়িয়ে যায় এক অদ্ভুত জাদুকরী দৃশ্যে:

  • লাল-সাদা পাথরের খিলান: প্রায় ৮৫০টিরও বেশি মার্বেল ও গ্রানাইটের তৈরি স্তম্ভের ওপর নির্মিত দ্বৈত খিলান (Horseshoe Arches) যা দেখতে একদম তালগাছের বনের মতো মনে হয়।

  • সোনালী ক্যালিগ্রাফি ও কারুকার্য: মসজিদের মেহরাবটি তৈরি করা হয়েছিল খাঁটি সোনা, মার্বেল ও মূল্যবান কাচের খণ্ড দিয়ে, যাতে কুরআনের আয়াত উৎকীর্ণ ছিল অনন্য ক্যালিগ্রাফিতে।

  • আলোকসজ্জা ও পরিবেশ: প্রদীপের আলো ও সুগন্ধি তেল ব্যবহারে পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ এক অপার্থিব ও প্রশান্তময় আবহ তৈরি করত।

জ্ঞানচর্চার বিশ্বকেন্দ্র

এই সুবিশাল মসজিদ সংলগ্ন এলাকা কেবল ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এতে গড়ে উঠেছিল একটি সুবিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঠাগার, যেখানে চার লক্ষাধিক দুর্লভ বই সংরক্ষিত ছিল। যখন পুরো ইউরোপের কোনো বড় পাঠাগারে কয়েকশর বেশি বই পাওয়া যেত না, তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুসলিম শিক্ষার্থীরা জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত ও দর্শন শিখতে করডোবায় ছুটে আসতেন। মহান দার্শনিক ইবনে রুশদ (Averroes) ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক আল-জাহরাবি এই করডোবা শহরেরই রত্ন ছিলেন।

পতন ও খ্রিস্টান শাসন প্রতিষ্ঠা

১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের খ্রিস্টান রাজারা কাস্টিল যুদ্ধের মাধ্যমে করডোবা শহর দখল করে নেয়। এর পর এই ঐতিহাসিক মসজিদটিকে গির্জায় পরিণত করা হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে মসজিদের মাঝখানের কিছু ঐতিহাসিক অংশ ভেঙে সেখানে ক্যাথেড্রাল বা প্রধান গির্জা নির্মাণ করা হয়। এমনকি স্পেনের তৎকালীন সম্রাট পঞ্চম চার্লস এই রূপান্তর দেখে আফসোস করে বলেছিলেন, “তোমরা এমন একটি অনন্য স্থাপত্য নষ্ট করেছ, যা বিশ্বজুড়ে আর কোথাও ছিল না।”

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ও বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে এটি ‘ক্যাথেড্রাল-মসজিদ’ নামে পরিচিত এবং এটি ইউনেস্কোর ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (UNESCO World Heritage Site)। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ পর্যটক এই স্থাপত্য দেখতে স্পেনে যান।

করডোবা মসজিদ আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্পেনে মুসলমানদের আটশত বছরের সেই ঐতিহ্য, সাম্য, পরমতসহিষ্ণুতা এবং ইসলামী স্বর্ণযুগের গৌরবময় অধ্যায়ের কথা।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator