জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধের সরকারি নির্দেশনা ও প্রশাসনের জারিকৃত নোটিশকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া প্রাঙ্গণ থেকে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিজ্ঞান অনুষদ ও ভাষা শহীদ রফিক ভবন প্রদক্ষিণ করে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। বিক্ষোভকারীরা ‘গরু খাওয়ার অধিকার, রুখে দেওয়ার সাধ্য কার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে এই নিষেধাজ্ঞাকে শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস নিয়ে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা এখন ক্যাম্পাসের স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন যে, প্রশাসন শিক্ষার্থীদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিবর্তে এ ধরনের অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করছে। জকসুর এজিএস মাসুদ রানা স্পষ্ট ভাষায় জানান, ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধের নোটিশটি সরাসরি শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। তিনি প্রশাসনকে অবিলম্বে এই নোটিশ প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়মিত মেনুতে গরু ও খাসির মাংসের অনুপস্থিতি এবং এই নিষেধাজ্ঞার ফলে তারা তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জকসু নেতৃবৃন্দ আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার বাদ জুমা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে ভোজের আয়োজনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এই কর্মসূচিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এদিকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক ফাতেমা তুজ জোহরা প্রশাসনের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ক্ষুদ্র একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসন আলোচনার পথ বেছে না নিয়ে একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিবেশকে বিনষ্ট করছে। জকসুর চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিতর্কিত নোটিশ প্রত্যাহার, ঘটনার পেছনে কোনো অশুভ উদ্দেশ্য আছে কি না তা তদন্ত করা, সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করা এবং ক্যাফেটেরিয়ার মেনুতে গরু ও খাসির মাংস অন্তর্ভুক্ত করা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না পাওয়া গেলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এই ঘটনাটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অদূরদর্শিতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্যাম্পাসজুড়ে চলমান এই অস্থিরতা যদি দ্রুত নিরসন না করা হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের জায়গা হওয়া উচিত। প্রশাসনের এখন উচিত আলোচনার টেবিলে বসে এই সংকটের সমাধান করা, অন্যথায় এই আন্দোলনের তীব্রতা ক্যাম্পাসের একাডেমিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে। শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় এবং ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।