ফারাওদের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা
প্রাচীন মিসরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পর ফারাওদের (মিসরীয় রাজা) আত্মা এক নতুন জগতে প্রবেশ করে। সেই পরকালের যাত্রাকে নিরাপদ রাখতে এবং ফারাও খুফুর (Khufu) মরদেহ ও ধনসম্পদ সুরক্ষিত রাখতেই খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৫৬০ অব্দে এই গ্রেট পিরামিড নির্মাণ করা হয়। প্রায় ২০ বছর ধরে চলা এই বিশাল যজ্ঞে দিন-রাত কাজ করেছিলেন লাখো শ্রমিক।
অবিশ্বাস্য ওজন ও গণিতের সূক্ষ্মতা
গিজার পিরামিডের প্রকৌশলবিদ্যা আধুনিক স্থপতিদেরও চমকে দেয়:
-
পাথরের ওজন: পিরামিডটি তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছিল প্রায় ২৩ লক্ষ বিশাল পাথরের ব্লক! এর প্রতিটি ব্লকের ওজন ছিল গড়ে ২.৫ থেকে ১৫ টন পর্যন্ত।
-
বিশাল উচ্চতা: নির্মাণের সময় এর উচ্চতা ছিল প্রায় ১৪৬.৬ মিটার (৪৮১ ফুট), যা প্রায় ৩৮০০ বছর ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু কৃত্রিম কাঠামো হিসেবে রেকর্ড ধরে রেখেছিল।
-
দিক-নির্ণয়ের সূক্ষ্মতা: কোনো আধুনিক কম্পাস না থাকা সত্ত্বেও পিরামিডটির চার কোণা একদম নিখুঁতভাবে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিকের সাথে সারিবদ্ধ (Align) করা।
কীভাবে তৈরি হয়েছিল পিরামিড?
পিরামিডের নির্মাণপদ্ধতি নিয়ে বহু শতাব্দী ধরে নানা থিওরি প্রচলিত ছিল। কেউ ভাবতেন ভিনগ্রহের প্রাণী বা এলিয়েনরা এটি বানিয়ে দিয়ে গেছে, আবার কেউ ভাবতেন দাসদের দিয়ে বলপ্রয়োগ করে কাজ করানো হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সেই ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দিয়েছে:
১. পাবলিক ওয়ার্কারদের শ্রম: উদ্ধার হওয়া নথিপত্র থেকে জানা যায়, পিরামিড তৈরিতে কোনো ক্রীতদাস নয়, বরং বেতনভুক্ত ও সম্মানিত দক্ষ কারিগর ও কৃষক শ্রমিকরা কাজ করেছিলেন।
২. ভিজে বালুর মেকানিক্স: অত ভারী পাথর কীভাবে ওপরে তোলা হয়েছিল? মিসরীয়রা কাঠের স্লেজে পাথর রেখে তার সামনের বালুতে পানি ঢালত। এতে বালুর ঘর্ষণ (Friction) প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যেত, ফলে টেনে পাথর তোলা অনেক সহজ হতো।
৩. নদী পথ ব্যবহার: পিরামিড বানানোর সাদা চুনাপাথর বহু দূর থেকে নীল নদ দিয়ে কাঠের ভেলায় করে গিজার কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়েছিল।
পিরামিড নিয়ে প্রচলিত রহস্য
পিরামিড কেবল একটি সমাধিস্তম্ভ নয়, এর ভেতরে রয়েছে অসংখ্য সুরঙ্গ ও গোপন কক্ষ। পিরামিডের ভেপাশের তাপমাত্রা সবসময় ধ্রুবক বা প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে, যা মরুভূমির তীব্র গরমের তুলনায় এক প্রাকৃতিক এসি বা এয়ার কন্ডিশনারের মতো কাজ করে।
শেষ কথা
সময়ের বিবর্তনে মিসরীয় সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ হয়েছে, নতুন নতুন বহু সভ্যতা এসেছে ও গেছে, কিন্তু গিজার গ্রেট পিরামিড আজও ধীরস্থিরভাবে জানান দিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন মানুষের অসীম বুদ্ধিমত্তা ও অসাধারণ প্রকৌশলবিদ্যার কথা। ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এটি চিরকালই এক অপার বিস্ময় ও আকর্ষণ হয়ে থাকবে।