সাতক্ষীরাসহ খুলনা অঞ্চলে আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল, ফলন নিয়ে আশাবাদী কৃষক.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সাতক্ষীরাসহ খুলনা অঞ্চলে আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল, ফলন নিয়ে আশাবাদী কৃষক..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক: avatar   
শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক:
সাতক্ষীরাসহ খুলনা অঞ্চলে আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল, ফলন নিয়ে আশাবাদী কৃষক..
সাতক্ষীরাসহ খুলনা অঞ্চলে আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল, ফলন নিয়ে আশাবাদী কৃষক..
ছবি: সংগৃহীত
দিগন্তজুড়ে সবুজ ধানখেত, বাতাসে দুলছে আমনের শীষ। মাঠজুড়ে কৃষকের ব্যস্ততা আর প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ জানান দিচ্ছে নতুন ফসলের আগমনী বার্তা..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:

দিগন্তজুড়ে সবুজ ধানখেত, বাতাসে দুলছে আমনের শীষ। মাঠজুড়ে কৃষকের ব্যস্ততা আর প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ জানান দিচ্ছে নতুন ফসলের আগমনী বার্তা। অনুকূল আবহাওয়া, বৃষ্টিপাতের ভারসাম্য এবং জলাবদ্ধতা কম থাকায় চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরাসহ খুলনা কৃষি অঞ্চলে আমন ধানের বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষকেরা। ইতোমধ্যে চার জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি জমিতে চাষ সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোথাও লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে আবাদ।

তবে ভালো ফলনের সম্ভাবনায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেও উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া এবং ফসল সংরক্ষণের সুযোগ নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ। কৃষকেরা বলছেন, ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি বাজারে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে সংসারের ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ ও পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদে স্বস্তি ফিরবে।

সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মাঠে বেড়ে উঠেছে আমন ধান। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে দুলছে ধানের শীষ। গ্রামীণ জনপদের চারপাশে এমন সবুজের সমারোহ কৃষকের মনে জাগিয়েছে আশার সঞ্চার। কৃষকদের ভাষ্য, রোপণের পর থেকে এখন পর্যন্ত আবহাওয়া মোটামুটি অনুকূলে রয়েছে। ধানের বয়স বাড়ার এ সময়ে অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকা, সময়মতো বৃষ্টি এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম হলে এবার ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

তালা উপজেলার কৃষক শামীম সরদার এক একর জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহর রহমতে এবার ধানের অবস্থা খুব ভালো। গতবারের তুলনায় বিঘাপ্রতি তিন থেকে চার মণ বেশি ধান পাওয়ার আশা করছি। বাজারে ভালো দাম পেলে ধান বিক্রি করে সংসারের সব ঋণ শোধ করতে পারব।”

কৃষকদের প্রত্যাশা, অনুকূল পরিবেশ শেষ পর্যন্ত বজায় থাকলে আমনের উৎপাদন বাড়বে। তবে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পেলে ভালো ফলনের সুফল কৃষকের ঘরে পুরোপুরি পৌঁছাবে না। এ কারণে উৎপাদিত ধান সংরক্ষণের ব্যবস্থা, উপজেলা পর্যায়ে হিমাগার বা উপযুক্ত শস্য সংরক্ষণাগার স্থাপন এবং সরকারের মাধ্যমে সরাসরি ধান কেনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মৌসুমে ধানের দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা করা সহজ হবে।


খুলনা কৃষি অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও নড়াইল জেলায় চলতি মৌসুমে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ২ লাখ ৯০ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে। অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার জেলায় ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭৪ টন পরিষ্কার চাল, অর্থাৎ ১২ লাখ ৮৫ হাজার ৪৬১ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

খুলনা কৃষি অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, আমন ধানের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে ৭৫ হাজার ৪০০ কৃষককে ছয় কোটির বেশি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে। কৃষকদের সহায়তা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি বিভাগের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।


জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় ৮৯ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৯০ হাজার ১৬০ হেক্টরে। জেলায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮০ মেট্রিক টন ধান এবং ২ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫৩ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

খুলনায় ৮৮ হাজার ৩৫১ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৮৭ হাজার ৪৬৯ হেক্টরে। জেলাটিতে ৪ লাখ ৮ হাজার ৩০৮ মেট্রিক টন ধান এবং ২ লাখ ৭২ হাজার ২০৫ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাগেরহাটে ৬৮ হাজার ৮৯৩ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৬৮ হাজার ৭০৬ হেক্টরে। এ জেলায় ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৭১ হাজার ৬৮৮ মেট্রিক টন এবং চালের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৮১ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন।

অন্যদিকে, নড়াইলে ৪৩ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৪৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টরে। জেলাটিতে ২ লাখ ৬ হাজার ৬৮৬ মেট্রিক টন ধান এবং ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৯১ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা তামান্না তাছনীম বলেন, চলতি মৌসুমে আমন ধানের গাছের বৃদ্ধি ও সামগ্রিক অবস্থা আশাব্যঞ্জক। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম হলে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য কৃষকদের জমিতে নিয়মিত পরিচর্যা, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দমনে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত কৃষি বিভাগের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, এ বছর আমনের ভালো ফলন জেলার কৃষিতে নতুন গতি আনতে পারে। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা এবং তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ (৪০ কেজি) মোটা আমন ধান ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এই প্রত্যাশিত দাম শেষ পর্যন্ত কৃষকেরা পাবেন কি না, তা নির্ভর করবে মৌসুমের বাজার পরিস্থিতির ওপর।

সব মিলিয়ে, মাঠের সবুজ ধানখেত ঘিরে এখন কৃষকের স্বপ্ন বাম্পার ফলন। সেই স্বপ্নের পূর্ণতা দিতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ধানের ন্যায্যমূল্য, সহজলভ্য কৃষি উপকরণ এবং কার্যকর সংরক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তবেই আমনের সম্ভাব্য ভালো ফলন কৃষকের আর্থিক সচ্ছলতা ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator