প্রতিমায় মুগ ডাল-মুক্তার কারুকাজ, মণ্ডপে প্রযুক্তির ছোঁয়া—দুর্গোৎসবে নতুন রূপে সাতক্ষীরা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রতিমায় মুগ ডাল-মুক্তার কারুকাজ, মণ্ডপে প্রযুক্তির ছোঁয়া—দুর্গোৎসবে নতুন রূপে সাতক্ষীরা..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক: avatar   
শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক:
প্রতিমায় মুগ ডাল-মুক্তার কারুকাজ, মণ্ডপে প্রযুক্তির ছোঁয়া—দুর্গোৎসবে নতুন রূপে সাতক্ষীরা..
প্রতিমায় মুগ ডাল-মুক্তার কারুকাজ, মণ্ডপে প্রযুক্তির ছোঁয়া—দুর্গোৎসবে নতুন রূপে সাতক্ষীরা..
ছবি: সংগৃহীত
মুগ ডাল দিয়ে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা, দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠির সূক্ষ্ম কারুকাজ, ৩৫ হাজার মুক্তায় সাজানো প্রতিমা, ঝরনার পানিতে অক্ষত ফাইবারের দেবীমূর্তি—এমন নানা ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে উৎসবের অপেক্ষায় সাত..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা :

মুগ ডাল দিয়ে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা, দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠির সূক্ষ্ম কারুকাজ, ৩৫ হাজার মুক্তায় সাজানো প্রতিমা, ঝরনার পানিতে অক্ষত ফাইবারের দেবীমূর্তি—এমন নানা ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে উৎসবের অপেক্ষায় সাতক্ষীরা। কোথাও পৌরাণিক কাহিনির দৃশ্যায়ন, কোথাও বাংলার সোনালি আঁশ পাটের ঐতিহ্য, আবার কোথাও কর্ণফুলী টানেলের আদলে তৈরি পথ দিয়ে দেবী দর্শনের পরিকল্পনা। ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে শিল্প, সৃজনশীলতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এবার জেলার দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোতে থাকছে নানা চমক।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় এবার ৬১২টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে শেষ হবে উৎসব। এর আগে ১০ অক্টোবর পালিত হয়েছে মহালয়া।

উপকরণের বৈচিত্র্যে প্রতিমাশিল্পর মধ্যে 
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ব্রহ্মরাজপুর সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মন্দিরে প্রতিমার সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা। সূক্ষ্ম কারুকাজে প্রতিমাকে ভিন্নমাত্রা দিতে আয়োজকদের এ উদ্যোগ দর্শনার্থীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। গত বছর চিন্নিগুঁড়া চাল দিয়ে প্রতিমা সাজানোর পর এবার নতুন উপকরণে শিল্পকর্ম গড়েছেন তাঁরা।

দেবহাটা উপজেলার প্রতিমা শিল্পীরা জানান, নিখূঁত মূর্তি তৈরীতে করণীয় সব রকম উপকরন ব্যবহার করা হয়েছে। দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে প্রতিমার মাটির কাজ শেষে রং তুলির আঁচরে প্রতিমাগুলো জীবন্ত করে তুলেছেন তারা। 

আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা কাছারিপাড়া পূজামণ্ডপে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কেজি মুগ ডাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা। প্রতিটি ডাল যত্নসহকারে বসিয়ে দেবদেবীর অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীদের সময় লেগেছে প্রায় ১৫ দিন। প্রচলিত উপকরণের বাইরে গিয়ে খাদ্যশস্যের এমন ব্যবহার মণ্ডপটিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

একই উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তার কারুকাজে সাজানো হয়েছে ১৩টি প্রতিমা। শিল্পী প্রকাশ মণ্ডল ও তাঁর সহযোগীদের কয়েক মাসের পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এ সাজসজ্জা। এতে ব্যয় হয়েছে চার লাখ টাকার বেশি।

কলারোয়ার মুরারীকাটি পালপাড়ার একটি মণ্ডপে প্রায় ২৫ কেজি সাদা তিল ব্যবহার করে ১৬টি প্রতিমা সাজানো হয়েছে। চার শিল্পী প্রায় ১৫ দিনে কাজটি সম্পন্ন করেন। একই এলাকার অন্য একটি মণ্ডপে প্রায় ১২ কেজি চুমকি দিয়ে প্রতিমার পোশাক ও অলংকারে আনা হয়েছে ঝলমলে নকশা।

এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় শিল্পীরা প্রচলিত উপকরণের বাইরে গিয়ে প্রতিমাশিল্পে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন। তাঁদের সৃজনশীল উদ্যোগ দুর্গোৎসবের নান্দনিকতায় যোগ করছে ভিন্ন মাত্রা।

পৌরাণিক কাহিনি থেকে আধুনিক প্রযুক্তিতে 
সাতক্ষীরা শহরের কেন্দ্রীয় মন্দির ‘মায়ের বাড়ি’তে শতাধিক প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে পৌরাণিক যুগের বিভিন্ন দেবদেবীর লীলা ও কাহিনি। প্রতিমার বহুমাত্রিক উপস্থাপনা ও পৌরাণিক ঘটনাবলির দৃশ্যায়নে মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি হচ্ছে বিশেষ আবহ।

শ্যামনগর উপজেলার দক্ষিণ বড়কুপট নদীরপাড় দুর্গামন্দিরে নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার দুর্গাপ্রতিমা। মাটি ও ফাইবারের সমন্বয়ে তৈরি প্রতিমার পাশাপাশি দৃশ্যপটে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগ, সতীর নিথর দেহ কাঁধে নিয়ে শিবের তাণ্ডব, বীরভদ্রের আবির্ভাব এবং দক্ষযজ্ঞ ধ্বংসের ঘটনা। গত বছর একই মন্দিরে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার শ্রীবিষ্ণুর বিশ্বরূপ তৈরি করে দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছিলেন আয়োজকেরা।

সদরের মাগুরা কর্মকারপাড়ার কালীমন্দিরে ‘কৈলাস অনাদি মহাদেব’ ভাবনায় সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ। সেখানে কৈলাস পর্বতের আবহ, প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার শিবলিঙ্গ ও পঞ্চনাগের প্রতিকৃতি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলার অমিয়ান বাথুয়াডাঙ্গা সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে ককশিট বা ফোমশিট দিয়ে তৈরি প্রতিমার পাশাপাশি থাকছে ভাসমান সেতু ও বিশেষ আলোকসজ্জা। অষ্টমী, নবমী ও দশমীর রাতে ডিজিটাল আলোক প্রদর্শনীর পরিকল্পনা রয়েছে আয়োজকদের। পুরো আয়োজনের বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় আট থেকে ১০ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আরপাঙ্গাশিয়া রাসমন্দির প্রাঙ্গণে কর্ণফুলী টানেলের আদলে তৈরি করা হয়েছে একটি পথ। ওই পথ দিয়ে দর্শনার্থীরা প্রতিমা দর্শন করতে পারবেন। প্রচলিত মণ্ডপসজ্জার বাইরে এমন অভিজ্ঞতা দিতে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছেন আয়োজকেরা।

আশাশুনি উপজেলার খাজরা ইউনিয়নের ঘুঘুমারি শুরেরাবাদ সার্বজনীন মন্দিরে ফাইবার দিয়ে তৈরি প্রতিমার ওপর দিয়ে ঝরনার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির সংস্পর্শেও প্রতিমাগুলো অক্ষত থাকছে। আধুনিক উপকরণ ও শৈল্পিক পরিকল্পনার সমন্বয়ে তৈরি এ আয়োজন দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঐতিহ্যেও গুরুত্ব, নজর কেড়েছে পাটের সাজে
সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা পূজামণ্ডপে বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরতে ব্যবহার করা হচ্ছে পাট ও পাটজাত উপকরণ। পাটের আঁশ দিয়ে মণ্ডপসজ্জায় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশের পরিচিতি। পাশাপাশি প্রতিমার সাজে ব্যবহার করা হচ্ছে রেশমি সুতা ও অন্যান্য উপকরণ।

প্রতিমা নির্মাণে দেশলাই কাঠি, মুগ ডাল, মুক্তা, তিল ও চুমকির মতো উপকরণ যেমন নতুনত্ব এনেছে, তেমনি পাটের ব্যবহার স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সামনে আনার সুযোগ তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে জেলার বিভিন্ন মণ্ডপে স্থানীয় শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবার বিশেষভাবে চোখে পড়ছে।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় মণ্ডপের সংখ্যা ৬১২টি। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ১১১টি, তালায় ২০২টি, কলারোয়ায় ৪৬টি, দেবহাটায় ২১টি, আশাশুনিতে ১০৬টি, কালীগঞ্জে ৫৫টি এবং শ্যামনগরে ৭১টি মণ্ডপ রয়েছে।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, এবার সাতক্ষীরায় ৬১২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে যথাযথ নিয়মে পূজা আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

জেলাবাসীকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, কয়েক দিনব্যাপী এ উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন। এ জন্য পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

অন্যদিকে, সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম জানিয়েছেন, জেলা পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে ৬০৯টি মণ্ডপের তথ্য রয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এ সংখ্যা বাড়তে পারে। অর্থাৎ পূজা উদযাপন পরিষদ ও পুলিশের দেওয়া মণ্ডপের সংখ্যায় আপাতত তিনটির পার্থক্য রয়েছে।

পুলিশ সুপার জানান, পূজা নির্বিঘ্ন করতে জেলা পুলিশ প্রস্তুতি নিয়েছে। মণ্ডপগুলোতে টহল, সিসিটিভি নজরদারি, সাদা পোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতি এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকবে। উৎসব শান্তিপূর্ণ রাখতে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।

সম্প্রীতি ও নিরাপত্তাই হোক উৎসবের মূল শক্তিতে প্রতিমার বৈচিত্র্য, নান্দনিক মণ্ডপসজ্জা ও প্রযুক্তিনির্ভর আয়োজন দুর্গোৎসবকে দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুললেও উৎসবের মূল তাৎপর্য ধর্মীয় অনুশীলন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সম্প্রীতি। বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমে মণ্ডপগুলোতে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, ভিড় ব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আয়োজক ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, স্থানীয় শিল্পীদের সৃজনশীলতা, আয়োজকদের দায়িত্বশীলতা, প্রশাসনের সহযোগিতা এবং সব ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতিতে সাতক্ষীরার এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে উঠবে শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও আনন্দমুখর।

Nessun commento trovato


News Card Generator